শুক্রবার, ফেব্রুয়ারি ৩, ২০২৩
Homeরাজনীতি'১১ বছর ধরে রাজধানীর পান্থপথেই ছিলেন বিএনপি নেতা হারিছ চৌধুরী, অবিশ্বাস্য!'—মতিউর রহমান...

‘১১ বছর ধরে রাজধানীর পান্থপথেই ছিলেন বিএনপি নেতা হারিছ চৌধুরী, অবিশ্বাস্য!’—মতিউর রহমান চৌধুরী

আসলে হারিছ চৌধুরী ছিলেন ঢাকায়—ঢাকার কেন্দ্রে, পান্থপথে। মতিউর রহমান চৌধুরী মানবজমিনে এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে জানাচ্ছেন, সিলেট থেকে ঢাকায় আসার পর হারিছ চৌধুরী নাম বদল করেন। নতুন নাম রাখেন মাহমুদুর রহমান। পরিচয় দিতেন অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক হিসেবে। 

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামি হারিছ চৌধুরীকে হন্যে হয়ে খুঁজছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ২০০৭ সালে সেনাসমর্থিত সরকার ক্ষমতায় এলে হঠাৎ আত্মগোপনে চলে যান তিনি। পরের ১৪ বছর কোনো খোঁজ ছিল না। নানা সময় খবর আসে দেশের বাইরে আত্মগোপনে আছেন তিনি।

অবশেষে এক যুগের বেশি সময় পর এ বছরের শুরুর দিকে জানা গেল হারিছ চৌধুরী মারা গেছেন। তবে নিজ নামে মারা যাননি তিনি, মারা গেছেন মাহমুদুর রহমান নামে। এবং গত ১১ বছর তিনি বিদেশ নয়, ছিলেন পুলিশের নাকের ডগায়, ঢাকাতেই!

আজ (৬ মার্চ) দৈনিক মানবজমিন-এর সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে লিখেছেন কীভাবে মাহমুদুর রহমান নাম নিয়ে হারিছ চৌধুরী আত্মগোপন করে ছিলেন ঢাকার প্রাণকেন্দ্র পান্থপথে। সেই অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের সূত্র ধরেই দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড কথা বলে মতিউর রহমানের চৌধুরীর সঙ্গে।

মতিউর রহমানের নিজেরও বিশ্বাস হচ্ছে না, ইন্টারপোলের রেড লিস্টে নাম আছে, গোয়েন্দা দপ্তর যাকে চিরুনি তল্লাশি করে খুঁজছে, সেই মানুষটিই কিনা সবার নাকের ডগায় ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন খোদ ঢাকার বুকে। তা-ও এক-দুদিন নয়, নয় এক-দুই বছরও—মোটমাট এগারো বছর ছিলেন তিনি পান্থপথে।

‘যদি যোগাযোগের কোনো সুযোগ হতো, আমি তাকে (হারিছ চৌধুরী) এই প্রশ্নটাই প্রথম জিজ্ঞেস করতাম—কীভাবে পান্থপথের মতো জায়গায় থাকার কথা ভাবলেন? এটা এমন একটা জায়গা (কারওয়ান বাজারের খুব কাছে, শাহবাগও বেশি দূরে নয়, বেশি দূরে নয় সিআইডি কার্যালয় থেকেও) যেখানে এতগুলো মিডিয়া হাউজ,’ টিবিএসকে বলছিলেন দৈনিক মানবজমিনের সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী।

ওয়ান-ইলেভেনের পর হারিছ কিছুদিন সিলেটে ছিলেন, তা জানা হয়ে গিয়েছিল আগেই। তারপরই তিনি চলে যান সবার চোখের আড়ালে। একেবারেই গায়েব। হ্যাঁ, হারিছ চৌধুরী, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উপদেষ্টা।

মতিউর রহমান চৌধুরী বলেন, ‘আমি অবাক হচ্ছি তার সাহসের কথা ভেবে। অবশ্য আপনাকে জানতে হবে তিনি একজন প্রখর মেধাবী মানুষ ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি দু-দুটি বিষয়ে ডিগ্রি নিয়েছিলেন—লোকপ্রশাসন ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান। তিনি নিশ্চয় ভেবে থাকবেন, তার ঢাকায় অবস্থান নেওয়ার কথা কারোর ভাবনাতেই আসবে না। আর তিনি যে সঠিক ছিলেন, তা এখন প্রমাণিত।

‘তার ব্যাপারে আমার আগ্রহ ছিল গোড়া থেকেই। বিগত সরকারের আমলের সাজাপ্রাপ্ত সবার খবরই কিছু-না-কিছু জানা যাচ্ছে, কিন্তু এই মানুষটির কোনো খবর নেই। অনেকে ভাবছিল, তিনি লন্ডনে থাকবেন। আমি লন্ডনেও গেছি। খোঁজ করে নিশ্চিত হয়েছি, তিনি সেখানে নেই। একবার ভেবেছিলাম তিনি হয়তো তার নানাবাড়ি করিমগঞ্জে লুকিয়ে আছেন। ফলে এক পর্যায়ে আমার বিশ্বাস জন্মেছিল, তিনি ভারতে আছেন।’

কিন্তু আসলে হারিছ চৌধুরী ছিলেন ঢাকায়—ঢাকার কেন্দ্রে, পান্থপথে। মতিউর রহমান চৌধুরী মানবজমিনে এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে জানাচ্ছেন, সিলেট থেকে ঢাকায় আসার পর হারিছ চৌধুরী নাম বদল করেন। নতুন নাম রাখেন মাহমুদুর রহমান। পরিচয় দিতেন অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক হিসেবে।

এ সময় তিনি মাহমুদুর রহমান নামে একটি পাসপোর্টও নেন। তাতে ঠিকানা দেন, শ্রীমঙ্গল মৌলভীবাজার। বাবার নাম আবদুল হাফিজ।

২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ওই পাসপোর্ট ইস্যু করা হয়। পাসপোর্টে দেওয়া ছবিতে দেখা যায় তার চেহারায় অনেক পরিবর্তন—সাদা লম্বা দাড়ি, চুলের রং ধবধবে সাদা। শুধু পাসপোর্ট নয়, জাতীয় পরিচয়পত্রও পেয়ে যান মাহমুদুর রহমান নামে।

‘আমি ভাবছি জাতীয় পরিচয়পত্র জোগাড় করতে তাকে যেতে হয়েছিল নির্বাচন অফিসে। পাসপোর্ট করতেও সরকারি দপ্তরে যেতে হয়েছে। সেসব জায়গায় লম্বা লাইনও হয়। কেউ তাকে চিনল না? আসলে তিনি খুব বুদ্ধিমান মানুষ ছিলেন। পান্থপথের যে অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সে তিনি ভাড়া থাকতেন, সেখানে সবাই তাকে প্রফেসর সাহেব বলেই জানত। জানত ভালো মানুষ হিসাবে,’ বলছিলেন মতিউর রহমান।

মানবজমিনের প্রতিবেদন থেকে আরো জানা যাচ্ছে, একজন কাজের বুয়া ও একটি ছেলে থাকতো হারিছ চৌধুরীর সঙ্গে। বই পড়ে সময় কাটাতেন। নামাজ আদায় করতেন নিয়মিত। নানা রোগে আক্রান্ত ছিলেন। ওষুধ কিনতেন বাসার কাছের একটি ফার্মেসি থেকে। খুব প্রয়োজন ছাড়া বাসা থেকে বের হতেন না।

অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সের ম্যানেজার সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘আমি তিন বছর ধরে এখানে কাজ করছি। তার সম্পর্কে বেশি কিছু জানতাম না। শুনেছি তার স্ত্রী ও সন্তানরা লন্ডনে থাকেন। কোনোদিন কেউ তার কাছে আসেনি। আসা-যাওয়ার সময় তাকে সালাম দিতাম। তিনি হাসিমুখে সালাম নিতেন।’

হারিছ চৌধুরী কী ধরনের বই পড়তেন—এ প্রশ্নের জবাব মতিউর রহমান চৌধুরী বলেন, ‘আমার মনে হয় রাষ্ট্রবিজ্ঞানের বই-ই পড়তেন বেশি।’

হারিছের কোনো ডায়েরি বা তেমন কিছু খুঁজে পাওয়া গেছে কি না জানতে চাইলে মতিউর রহমান জানালেন এখনও তেমন কিছুর খোঁজ পাওয়া যায়নি। বলেন, ‘এটার খোঁজ করা যেতে পারে। যদি “আত্মগোপনের দিনগুলো” নামের কিছু লিখে গিয়ে থাকেন তো একটা পড়ার মতো ব্যাপারই হবে।’

মতিউর রহমান চৌধুরী। সংগৃহীত ছবি

টিবিএস: দেশে তার রাজনৈতিক সতীর্থরা কেউ জানতেন না?

মতিউর রহমান চৌধুরী: আমি শুনেছি, খালেদা জিয়া জানতেন তিনি ঢাকায় আছেন। কিন্তু কোথায় আছেন, তা বুঝি নিশ্চিত জানতেন না।

টিবিএস: আপনার প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, ছেলেমেয়েরা তার সঙ্গে যোগাযোগ করত। কীভাবে সেটা?

মতিউর: তিনি কোনো সেল ফোন ব্যবহার করতেন না। হয়তো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে আলাপ হতো।

টিবিএস: হারিছ চৌধুরী টাকা পেতেন কোথা থেকে?

মতিউর: সম্ভবত তার ভাই সেলিম চৌধুরী (সম্প্রতি মারা গেছেন) কোনো একভাবে তার কাছে অর্থ পৌছাতেন।

গত ১৫ জানুয়ারি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে মানবজমিন জানায়, হারিছ চৌধুরী করোনায় আক্রান্ত হয়ে ঢাকায় মারা গেছেন। আর তা নিশ্চিতও করেন হারিছের প্রবাসী মেয়ে ব্যারিস্টার সামিরা চৌধুরী। সামিরা জানান, গত ৩ সেপ্টেম্বর তার বাবা করোনায় আক্রান্ত হয়ে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে মারা গেছেন। কিন্তু গোল বাধে যখন হারিছ চৌধুরীর ভাই আশিক চৌধুরী জানান যে ঢাকায় নয়, লন্ডনে মারা গেছেন হারিছ চৌধুরী।

প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর গোয়েন্দারাও একাধিকবার মানবজমিনে ফোন করে আসল সত্য জানতে চান। তারপর থেকেই মতিউর রহমান চৌধুরী রহস্য উদঘাটনে লেগে যান।

তার অনুসন্ধানেই বেরিয়ে আসে মাহমুদুর রহমান নাম নিয়ে হারিছ চৌধুরী আত্মগোপনে ছিলেন ঢাকাতেই।  ছদ্মবেশ নেননি, বরং বয়স তাকে বদলে দিয়েছিল—আর সে সুযোগেই তিনি অচেনা হয়ে থাকতে পেরেছিলেন।

কাছের একটি মুদি দোকান থেকে চাল, ডাল, তেলসহ প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতেন হারিছ। দোকান মালিক মোহাম্মদ সুজন বলেন, ‘তিনি তো খুব ভালো মানুষ ছিলেন।’

ফ্ল্যাট মালিকও বলেন, প্রফেসর সাহেব নিয়মিত ভাড়া দিতেন। ভালো মানুষ ছিলেন।

মানবজমিনের প্রতিবেদন জানাচ্ছে, গত ২৫ আগস্ট করোনায় আক্রান্ত হারিছ চৌধুরী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন মাহমুদুর রহমান নামেই। দাফনও এই নামেই হয়। ৩ সেপ্টেম্বর মারা যান তিনি। তার মৃতদেহ গ্রহণ করেন মেয়ে সামিরা চৌধুরী।

ছবি কৃতজ্ঞতা: মতিউর রহমান চৌধুরী/ মানবজমিন

মরদেহ মোহাম্মদপুর নিয়ে গিয়ে সেখানকার মাইকআউস স্টোর থেকে কাফনের কাপড় কেনেন বলে জানান সামিরা। তারপর আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে পরামর্শে করে সাভারের লালাবাদ কমলাপুরের জামিয়া মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে দাফন করা হয় হারিছ চৌধুরীকে।

বাবার মৃত্যু নিয়ে এত গোপনীয়তা কেন, জানতে চাইলে সামিরা চৌধুরী মানবজমিনকে বলেছিলেন, ১৪ বছর আত্মগোপনে থাকার মানুষটার মৃত্যুর খবর প্রকাশ করা তাদের জন্য সহজ ছিল না। নানা ভয় আর আতঙ্ক কাজ করেছে তাদের মধ্যে।

তবে অধ্যাপক মাহমুদুর রহমানই যে তার বাবা হারিছ চৌধুরী, তা নিশ্চিত করেছেন সামিরা। বলেছেন, প্রয়োজনে ডিএনএ টেস্ট করেও তার বাবার পরিচয় নিশ্চিত করা যায়।

সামিরা মানবজমিনকে আরও জানিয়েছিলেন, বাবা জীবিত থাকতে তিনি লন্ডন থেকে একাধিকবার তার [হারিছের] সঙ্গে কথা বলেছি। এমনকি সামিরার স্বামীও চার বছর আগে ঢাকায় এসে হারিছের সঙ্গে দেখা করে গেছে। ছেলে নায়েম শাফি চৌধুরীর সঙ্গেও হারিছের নিয়মিত যোগাযোগ ছিল।

হারিছ চৌধুরী দুবার আত্মসমর্পণ করতে চাইলেও তার পরামর্শকরা এতে সায় দেননি বলে জানায় মানবজমিন।

মতিউর রহমান চৌধুরী টিবিএসকে বলেন, ‘মহামান্য আদালত কয়েকবারই তার সম্পর্কে জানতে চেয়েছেন বিগত বছরগুলোয়। ইনস্ট্রাকশনও দিয়েছেন। কিন্তু মানুষটা আসলেই মনে হয় কর্পূরের মতো উবে গিয়েছিলেন। বুদ্ধিমান মানুষ ছিলেন বলেই এটা সম্ভব হয়েছে। আশপাশের সবাই তাকে ভালো মানুষ বলে জানত। কারোর মনেই কখনো সন্দেহ জাগেনি।’

এ ব্যাপারে আরও অনুসন্ধান চালাবেন কি না প্রশ্ন করলে মতিউর রহমান জানান, তার অনুসন্ধান কার্যক্রম জারি থাকবে। বলেন, ‘আমার তো মনে হয় এখনও অনেক কিছু জানা বাকি আছে। কাজেই অনুসন্ধান অব্যাহত থাকবে। শেষ জীবনটা সিনেমার মতো পার করে গেলেন হারিছ চৌধুরী। আমার বিস্ময় কাটছে না।’- দি বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড

সর্বশেষ সংবাদ