শনিবার, ফেব্রুয়ারি ৪, ২০২৩
Homeগ্রীনসিটি স্পেশালরাজশাহীতে ঠিকানা চান ‘শখের হাড়ি’র কারিগর সুশান্ত

রাজশাহীতে ঠিকানা চান ‘শখের হাড়ি’র কারিগর সুশান্ত

নিজস্ব প্রতিবেদক:

‘এবছরও হচ্ছে না বৈশাখী মেলা’-বলেই দীর্ঘশ্বাস নিলেন ‘শখের হাড়ি’র কারিগর সুশান্তকুমার পাল। কর্মচাঞ্চল্যের তুঙ্গ মুহূর্তে অলস সময় কাটাচ্ছেন তিনি। কাজের কোনো গরজ নেই। কে কিনবে হাতের নিপুন ছোঁয়ায় গড়া শিল্প-সৌন্দর্য?
ভারি গলায় শিল্পী সুশান্ত বললেন, ‘করোনার কারণে গত দুই বছর হয়নি বৈশাখী মেলা। এবছরও হচ্ছে না। মেলায় না উঠলে কে কিনবে তার শিল্প-সম্ভার?’

শিল্পী সুশান্তের ভাষায় তাঁর শিল্প ‘শখের হাড়ি’র চাহিদার মোটেও কমতি নেই। কিন্তু ধারা অনুযায়ী তাঁর শিল্প সম্ভার বাংলা নববর্ষ-উপলক্ষ ধরেই বাজারজাত হয়ে থাকে। যা আয় হয় তা যথেষ্ট, চলে যায় সংবছর। কিন্তু এখন সুশান্তের পরিবার নিয়ে খেয়ে-পরে বেচে থাকাই দায়। তাঁর হিসেবে তিন বছরে ১০ থেকে ১১ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে। শখের হাড়ি বস্তাবন্দি করে তুলে রাখা আছে।

শখের হাড়ি রাজশাহীর শিল্প অথচ রাজশাহীতেই নেই প্রদর্শনীর কোনো ব্যবস্থা। জেলা প্রশাসন, রাজশাহী চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি রাজশাহীর শিল্প বিবেচনায় শখের হাড়ি প্রদর্শন ও বিক্রির ব্যবস্থা করে দিতে পারে। তাতে এই শিল্পের সাথে জড়িতরাই কেবল উপকৃত হবে নাÑ রাজশাহীর শিল্প-নিদর্শন সম্পর্কেও রাজশাহীর মানুষের ধারণা লাভ করা সম্ভব হবে। পর্যটন বিকাশের চলমান সন্ধিক্ষণে শখের হাড়ি নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। এই অনুভব- অসহায় মৃতশিল্পীদের।

রোববার (১০ এপ্রিল)। বাংলা ২৭ চৈত্র। দুপুর সাড়ে ১২টা। বৈশাখ ঘনিয়ে আসলেও সুশান্তের বাড়িতে নেই কর্মব্যস্ততা। করোনার আগের বছরেও এই সময়ে শখের হাড়ি তৈরিতে দম ফেলার সময় ছিল না। ওই সময় কারুশিল্পী সুশান্ত ছিলেন ঢাকায়। তিনি কিছু শখের হাড়ি নিয়ে সেখানে মেলার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। আর ছেলেরা রাজশাহীতে ব্যস্ত ছিলেন। ছেলে, ছেলে বৌ, নাতি, নাতনিদেরও আরাম ছিল না।

এখন সুশান্তের বসন্তপুরের বাড়ি প্রায় নিরব। নেই চাকির শব্দ, নেই শিল্পে শিল্পের সমাহার, নেই কর্মগুঞ্জন।
বাড়ির দক্ষিণের বারান্দায় একাকি বসে মুঠোফোনে গান শুনতে শুনতে কাজ করতে দেখা গেল সঞ্জয় পালকে। তাও আবার ধীর স্থিরে। তিনি অল্প কিছু শখের হাড়ি তৈরি করেছেন। সেগুলো রোদে শুকাতে দিচ্ছে।

কিছুক্ষণ পর হলুদ রঙ করা শখের হাড়িতে বিভিন্ন চিত্র আঁকতে দেখা গেল।
সুশান্তকুমার পালের ছেলে সঞ্জয় পাল জানান, এবছর বৈশাখে মেলা হওয়ার সিদ্ধান্ত এখনও হয়নি। কিছু শখের হাড়ি প্রস্তুত করে রাখছি, যদি কোথাও বিক্রি করা যায়!

সঞ্জয় পাল জানান, মেলা হবে কী না জানিনা। বৈশাখের কয়েকদিন বাকি। এখনও ডাক পায়নি কোথাও থেকে। শুধু সোনারগাঁয়ে একদিনের জন্য অল্প পরিসরে মেলা বসবে শুনেছি। সেখানে অল্প কিছু শখের হাড়ি নেয়া হবে। এবছর পবিত্র রমজান মাসের কারণে মেলায় তেমন মানুষ হবে না। আর মেলাকে ঘিরে কোনো ধরনের সংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও নেই। তাই তুলনামূলক দর্শনার্থী কম হবে।

কারুশিল্পী সুশান্ত কুমার পাল জানান, করোনার কারণে বিগত দুই বছর মেলা হয়নি। শখের হাড়ি তৈরি করেও বস্তা বন্দি করে রেখেছিলাম। এবছরও একই অবস্থা। এবছর সোনারগাঁয়ে একদিন ছাড়া আর কোথায় হচ্ছে না মেলা। ধারণা করা হচ্ছে, রমজান মাস হওয়ায় মানুষ তেমন বাইরে থাকে না।

তিনি বলেন, শখের হাড়ি তৈরি বিক্রি আমার নেশা ও পেশা। শুরুতে নেশা থাকলেও পরের দিকে পেশায় পরিণত হয়েছে। এবছর দিয়ে তিন বছর হলো না বৈশাখী মেলা। তাতে লোকসানের মধ্যে রয়েছে।

সুশান্তকুমার পাল আক্ষেপ করে বলেন, ‘রাজশাহীর পবার বসন্তপুরে শখের হাড়ি সবাই চেনে। কারিগর সুশান্ত কুমার পালকেও মোটামোটি সবাই চেনে। শুধু চেনে না রাজশাহীর মানুষ। রাজশাহীতে যে শখের হাড়ির জন্ম; কিন্তু রাজশাহীতেই নেই ঠিকানা। আমি রাজশাহীতে শখের হাড়ির একটা ঠিকানা চাই।’

সর্বশেষ সংবাদ