ঢাকাবৃহস্পতিবার , ১৬ জুন ২০২২
  • অন্যান্য

খুলছে দখিনা দুয়ার

জুন ১৬, ২০২২ ১১:০৩ পূর্বাহ্ণ । ১৫৪ জন

‘‘খুলে গেলো দক্ষিণা দ্বার
আলোকিত পদ্মা পাড়
পুলকিত জাতির সত্তাসার
পদ্মা সেতু মোদের অহংকার
আমরাও পারি সব উচুঁ রেখে শীর
বিশ্ব দেখুক আজ আমরাও বীর।’

কোটি কোটি বাঙালির হৃদয়ে লালিত দীর্ঘ দিনের স্বপ্নটির চূড়ান্ত পূর্ণতা পেতে চলেছে ২৫ জুন ২০২২ তারিখে। এই দিনে স্বপ্নের পদ্মা সেতু উদ্বোধন করবেন উন্নয়নের রূপকার বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এই দিনটি বাঙালির কাছে এক চরম আনন্দের দিন, পরম প্রাপ্তির দিন। অন্যভাবে বলা যায়, একটি একটি বিজয়ের দিন। যে বিজয় আমাদের অর্থনৈতিক বিজয়, যে বিজয় আমাদের সক্ষমতার বিজয়। এটিকে আমরা বড় বিজয় বলতে পারি, কেননা পদ্মা সেতুর মত একটি দুঃসাহসিক অভিযানের সফল সমাপ্তি ২৫ জুন ঘটতে চলেছে। পদ্মা সেতু আমাদের জাতীয় অর্জন, এটি আমাদের সক্ষমতার সাক্ষর বহন করে। আর এই জাতীয় অর্জনটি সম্ভব হয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অদম্য সাহসিকতা, প্রজ্ঞা আর দায়বদ্ধতার কারণে। পদ্মা সেতু যে আমাদের এক মহা অর্জন সেটা নিয়ে প্রশ্ন তোলার কোন সুযোগ নেই। কিন্তু জাতীয় সংসদে বি এন পি দলীয় সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা পদ্মা সেতুর নির্মাণ খরচ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এবং একটি তুলনামূলক চিত্র উপস্থাপন করেছেন। তিনি কিছু তথ্য উপাত্ত দিয়ে তার বক্তব্য দেয়ার চেষ্টা করেছেন। বিরোধী দলের সংসদ সদস্য হিসাবে তিনি সেটা করতেই পারেন। এক্ষেত্রে সরকারি দলের উচিত ছিল আরো বেশি তথ্য উপাত্ত দিয়ে পদ্মা সেতুর নির্মাণ খরচ কেন ৩০ হাজার কোটি টাকা হল সেটা ব্যাখ্যা করা। এতে জনগণ পুরো বিষয়টি জানতে পারতো এবং রুমিন ফারহানার অভিযোগ কতটুকু সত্য তা বুঝতে পারতো। রুমিন ফারহানা পদ্মা সেতুকে একটি উদাহরণের মাধ্যমে গোল্ডেন ব্রিজ বলতে চেয়েছেন। অধিক খরচ হয়েছে বলে এটাকে তিনি গোল্ডেন ব্রিজ বলেছেন। সমালোচনা করতে গিয়ে তিনি এটাকে স্বর্ণ সেতু বলেছেন। আমরাতো মনে করি, এটা আসলেই একটি স্বর্ণ সেতু, তবে সেটা রুমিন ফারহানার ব্যাখ্যার মত নয়। জনগণের কাছে এই সেতুটি একটি স্বর্ণের খনির মত। দক্ষিণ অঞ্চলের মানুষের কাছে এটি যে একটি দামী স্বর্ণ টুকরা। তিনি আরো দাবি করেছেন যে পদ্মা সেতু ‘দুর্নীতির টেক্সটবুক এক্সাম্পল’ হয়ে থাকবে। তবে তিনি তার বক্তব্যের সপক্ষে জোরালো কোন ডাটা বা যুক্তি দিতে পারেন নি। তিনি ভারতের ভুপেন হাজারিকা সেতুর উদাহরণ দিয়ে পদ্মা সেতুর অতিরিক্ত ব্যয়ের চিত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ৯ কিলোমিটার ভুপেন হাজারিকা সেতু নির্মানে ব্যয় হয়েছে ১ হাজার ১০০ কোটি রুপি, অথচ পদ্মা সেতুতে খরচ হয়েছে ৩০ হাজার কোটি টাকা। তিনি শুধু তুলনা দিয়েই তার বক্তব্য শেষ করেছেন। কিন্তু ভুপেন হাজারিকার সাথে পদ্মা সেতুর নির্মাণ শৈলীর যে আকাশ পাতাল ব্যবধান রয়েছে তা তিনি তুলে ধরার প্রয়োজন মনে করেন নি। ভুপেন হাজারিকা সেতুর নির্মাণ শুরু হয় ২০১১ খ্রিষ্টাব্দের নভেম্বর মাসে এবং নির্মাণ শেষ হয় ২০১৭ খ্রিষ্টাব্দের মার্চ মাসে। আমাদের পদ্মা সেতুর নির্মাণ শেষ হচ্ছে ২০২২ খ্রিষ্টাব্দে। তার মানে ভুপেন হাজারিকা থেকে ৫ বছর পর আমাদের পদ্মা সেতুর নির্মাণ শেষ হল। এই ৫ বছরে নির্মাণ ব্যয় কত বেড়েছে, শ্রমিকের মজুরি কত বেড়েছে, নির্মাণ সামগ্রির দাম কত বেড়েছে, তা রুমিন ফারহানা এড়িয়ে গেছেন। ভুপেন হাজারিকা সেতুর দৈর্ঘ্য পদ্মা সেতুর থেকে বেশি, কিন্তু পদ্মা সেতুর অবকাঠামোগত জটিলতা ভুপেন হাজারিকার চেয়ে বহুগুণে বেশি। উত্তাল স্রোত, নদীর গভীর তলদেশ, বহু গভীরে পাথরের স্তর থাকা, বৈরি আবহাওয়া এবং প্রমত্তা নদীর অস্বাভাবিক আচরণ পদ্মা সেতুর নির্মাণকে জটিল করে তুলেছিল। আর সেই জটিলতাকে মোকাবিলা করে এগিয়ে যেতে খরচ তো বাড়ার কথাই।

আমাদের পদ্মা সেতুর রূপ কতটা ভয়ংকর তাতো সেই পরিচিত গানেই তুলে ধরা হয়েছে- ”পদ্মারে তোর তুফান দেইখা পরান কাঁপে ডরে, ফেইলা আমায় মারিস না তোর সর্বনাশা ঝড়ে।” যাহোক দুটি সেতুর পাইলিং চিত্র দেখলেই খরচ কেন বেশি হয়েছে তা বুঝা যায়। ভুপেন হাজারিকার পাইল লোড যেখানে ৬০ টন আমাদের পদ্মা সেতুর পাইল লোড সেখানে ৮ হাজার ২০০ টন। বিশ্বের আর কোন সেতুতে নদীর এত গভীরে পাইল করতে হয়নি, যেটা পদ্মা সেতুতে করতে হয়েছে। ভুপেন হাজারিকা সেতুটি দুই লেন বিশিষ্ট। কিন্তু আমাদের পদ্মা সেতুটি দ্বিতল সেতুর নিচের অংশে চলবে ট্রেন, আর উপরে অন্যান্য যানবাহন। পদ্মা নদীতে প্রতি সেকেন্ডে ১ লাখ ৪০ হাজার ঘনমিটার পানি প্রবাহিত হয়। আর এটাকে চ্যালেঞ্জ করে নদীর তলদেশের ১২২ মিটার গভীরে পাইল নিয়ে যাওয়া কি সহজ কোন ব্যাপার? এর জন্য কি নির্মাণ ব্যয় বাড়ে না? পদ্মা সেতুর পাইল অধিক গভীরে নেয়ার জন্য বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী হাইড্রোলিক হ্যামার ব্যবহার করা হয়েছে যা বিশ্বের অন্য কোন সেতুতে করা হয়নি। এর ফলে কি খরচ বহু গুণে বেড়ে যাওয়ার কথা নয়? পদ্মা সেতুতে ব্যবহৃত পাথরের প্রতিটির ওজন ১ টন যা অন্য সেতুতে কল্পনাও করা যায় না। ৩৮৩ ফুট গভীরে পাইল লোড করতে হয়েছে এবং এই পাইল গুলির উপরে ৫০ হাজার টনের প্রতিটি পিলার দাঁড়িয়ে আছে। অথচ ভুপেন হাজারিকা সেতুর প্রতিটি পিলার মাত্র ২০ টনের। তাই শুধু তুলনা করলেই হবে না বাস্তবতার নিরিখে কথা বলা প্রয়োজন। পদ্মা সেতুর মত এমন স্রোতস্বিনী নদীতে বিশ্বে আর কোন সেতু নির্মিত হয়েছে বলে আমার জানা নেই। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি মাথায় রেখে সেতুটি নির্মাণ করা হয়েছে। আগামী ১০০ বছরে সেতু এলাকায় ২৬ শতাংশ বৃষ্টি বাড়বে। এতে সেখানে পানির প্রবাহ ১৬ শতাংশ বাড়বে। বাড়তি পানির চাপ মাথায় রেখেই সেতুর নকশা করা হয়েছে। প্রতি সেকেন্ডে ১৫০ কিউবেক পানি প্রবাহিত হবে।

যাহোক আমি কোন প্রকৌশলী নই, তাই বিস্তারিত ব্যাখ্যা আমার জন্য অসম্ভব। সংসদে আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন- পদ্মা সেতু ষড়যন্ত্রের জবাব, অপমানের প্রতিশোধ। তিনি আরো বলেছেন যে এই সেতু শুধু সেতু নয়, এটি প্রকৌশল জগতে এক বিস্ময়। প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, তিনি অন্যায়ের কাছে মাথা নত করেন নি। পদ্মা সেতু আত্মবিশ্বাস সৃষ্টি করেছে এবং দেশের মর্যাদা সারা বিশ্বে উজ্বল করেছে। যাহোক পদ্মা সেতু এক নতুন যুগের সূচনা করতে চলেছে এতে আমাদের কোন সন্দেহ নাই। জাতির জনকের কন্যা উন্নয়নের রূপকার, অদম্য সাহসী শেখ হাসিনা তার বাবার মতই আত্মবিশ্বাসী আর দূরদর্শীতার পরিচয় দিলেন পদ্মা সেতুর মত একটি বিশ্ব নজীর সৃষ্টি করে। ৬.১৫ কিলোমিটারের এই স্বপ্নের সেতু জাতিকে উপহার দিতে পরতে পরতে শ্বাপদ-সংকুল পথে হাটতে হয়েছে তাকে। কিন্তু দুর্গমগিরি কান্তার মরু পাড়ি দিয়ে প্রতিটি বাঁকে অবিচল থেকে তিনি তার গন্তব্যে ঠিকই পৌছে গেছেন, আর সেই সাথে বিশ্বের মানচিত্রে সোনার বাংলার আরেকটি অনন্য অর্জন ঠাঁই পেলো। ২৫ জুন জমকালো অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে সেতু উদ্বোধন করা হবে এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার জাতির কাছে দেয়া প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করবেন সেদিন। সমগ্র জাতির জন্য এটা প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ উপহার, ঈদের উপহার। সেতুর জন্মলগ্নে ষড়যন্ত্রের যে বিষবাষ্প ছড়িয়ে দেয়া হয়েছিল সেটাকে দৃঢ়তার সাথে মোকাবিলা করে সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করলেন। শেখ হাসিনা প্রমাণ করলেন সদিচ্ছা আর সৎ নিয়ত থাকলে হিমালয়ও জয় করা যায়। পদ্মা সেতু শেখ হাসিনার দূরদর্শী নেতৃত্বের সাক্ষর বহন করে।

বাংলাদেশের সক্ষমতা কতটুকু তা বিশ্ববাসী ভালভাবেই জানার সুযোগ পেল। দুর্নীতির কলঙ্ক টিকা লেপন করে সেতুর অগ্রযাত্রাকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করার অপচেষ্টা চলেছিল। বিশ্ব ব্যাংক এবং দাতারা মুখ ঘুরিয়ে নিলেও বঙ্গবন্ধু কন্যা তো তা পারেন না। তিনি বাংলাদেশের নেতা, কোটি কোটি মানুষের স্বপ্ন সারথী। তাই নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু করার ঘোষণা দিলেন তিনি। সমালোচকেরা তখন মুখ ভেচকি টেনে হেসেছিলেন, নানা নেতিবাচক মন্তব্যের ফুলঝুঁরি তৈরি করেছিলেন। পদ্মা সেতু করা হাসিনার পক্ষে সম্ভব হবে না এমন ঢেকুর বিজ্ঞজনের মুখে দেখেছি। বিরোধী জোটতো বরাবরই নেতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছে। বিরোধী দল বিরোধিতা করবে এটা না হয় মেনে নিলাম। কিন্তু অনেক বিশেষজ্ঞকে দেখেছি গণমাধ্যমে হতাশার বাণী শোনাতে। যাহোক শেখ হাসিনা সেগুলো শুনেছেন, দেখেছেন তবে কানে তোলেন নি। তিনি তার সিদ্ধান্তে অনড় থেকেছেন। নির্মাণ কাজ শুরুর পর মহা চ্যালেঞ্জ সামনে এসে দাঁড়ায়। নদী শাসন এবং পাইলিং এ সাহসী এবং যুগান্তকারী ইঞ্জিনিয়ারিং দক্ষতার প্রয়োজন হয়। একই সাথে বাড়তে থাকে নির্মাণ ব্যয়। সেতুর নির্মাণ কাজ যখন পুরোদমে চলছিলো তখনই শুরু হলো করোনার ছোবল। কিন্তু শেখ হাসিনার অদম্য ইচ্ছায় সেতুর কাজ একদিনও বন্ধ থাকে নি। করোনাকে মোকাবিলা করে এগিয়ে গেছে পদ্মা সেতুর কাজ। সবাই যখন দেখলো শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সেতুর কাজ এগিয়ে যাচ্ছে তখন কতিপয় অসাধু ও ষড়যন্ত্রকারী গুজব ছড়াতে লাগলো। মানুষের মাথা দরকার হবে সেতু নির্মাণে এমন গুজব রটানো হল। সেটাকেও সরকার দক্ষতার সাথে মোকাবিলা করেছে। নির্মাণ সময় ও নির্মাণ ব্যয় দুটোই বেড়েছে। নির্মাণ ব্যয় নিয়ে বিভিন্ন মত থাকলেও সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক বিষয় হল যে, সেতুর নির্মাণ সমাপ্ত হয়েছে এবং ২৬ জুন থেকে সর্ব সাধারণের জন্য খুলে দেয়া হবে। সেতুটির সাথে রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও সমাজনীতি সম্পর্কিত। সেতুটি নির্মাণ করা ছিল সরকারের একটি বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ। রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি পূরুণে সরকার বদ্ধপরিকর ছিল। সেতুটি খুলে দেয়ার পর সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবে দেশের অর্থনীতি। দেশের অর্থনীতির চেহারাই বদলে যাবে। কৃষির ব্যাপক উন্নয়ন ঘটবে। রাজধানীতে দক্ষিণ পশ্চিম অঞ্চল থেকে কৃষি পণ্য পরিবহনে এক যুগান্তকারী অধ্যায়ের সৃষ্টি হবে। কৃষকেরা পণ্যের ভাল মূল্য পাবে। পদ্মা সেতুকে কেন্দ্র করে দেশের দক্ষিণ পশ্চিম অঞ্চলে ব্যাপক শিল্পায়ন ঘটবে। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের একটি অংশে পরিণত হতে পারে এই পদ্মা সেতু। যোগাযোগ এবং পরিবহন খাতে রীতিমত বিপ্লব সাধিত হবে। সেতুটিকে কেন্দ্র করে পর্যটন শিল্পের ব্যাপক উন্নয়ন সাধিত হবে। পদ্মা সেতুকে ঘিরে উঁকি দিচ্ছে সম্ভাবনার পর্যটন। বর্তমানে শুক্র ও শনিবার সেতু এলাকায় দর্শনার্থীর সংখ্যা ১০ হাজারের বেশি থাকে। সপ্তাহের অন্যান্য দিনেও প্রচুর ভিড় থাকে। উদ্বোধনের পর পর্যটকের সংখ্যা আরো বাড়বে। ঘুরে দাঁড়াবে পর্যটন খাত এবং দেশের অর্থনীতি। ইতোমধ্যে বেশ কিছু ট্যুর এজেন্সি সেতু এলাকায় ইলিশভোজ সহ একদিনের প্যাকেজ ট্যুর ঘোষণা করেছে। দ্রুত সময়ে ঢাকা থেকে যাওয়া যাবে সুন্দরবন ও সাগরকন্যা কুয়াকাটায়। দক্ষিণ পশ্চিম অঞ্চলে গড়ে উঠবে নতুন নতুন পর্যটন স্থাপনা। এসব পর্যটন কেন্দ্রে বহু মানুষের কর্মসংস্থান হবে। উন্নত হবে পদ্মা বিভাগ ( ফরিদপুর, রাজবাড়ি, মাদারিপুর, শরীয়তপুর ও গোপালগঞ্জ নিয়ে গঠিত)। দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়বে ১.২ শতাংশ। প্রতি বছর ০.৮৪ শতাংশ হারে দারিদ্র বিমোচন হবে। সেতুর মুন্সিগঞ্জ ও শরীয়তপুর অংশে ৬ লেন বিশিষ্ট একপ্রেসওয়ে তৈরি করা হয়েছে যা অত্যন্ত নয়নাভিরাম ও মনোমুগ্ধকর। রাতের এক্সপ্রেসওয়ে এক ভিন্ন রূপ ধারণ করে। ভাঙ্গা চত্ত্বরে নয়নাভিরাম দৃশ্য দর্শককে মুগ্ধ করবে। সেতুর ৪১৫ টি ল্যাম্পপোস্ট সেতুকে এক ভিন্ন রূপ দিবে। রাতের রাণীতে পরিণত হবে সেতুটি। পদ্মা সেতু হয়ে যোগাযোগ হবে অত্যন্ত আরামদায়ক এবং জ্যামমুক্ত। অল্প সময়ে মানুষ অধিক দূরুত্বে ভ্রমণ করতে পারবে। সংস্কৃতির ক্ষেত্রে এই সেতু এক অনন্য ভূমিকা রেখে যাবে। এই সেতুকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠবে রিসোর্ট, হোটেল ও রেস্তোরাঁ, যেখানে বাঙালি খাবারের পরিবেশনা থাকবে যা বিদেশিদের নিকট বাঙালি সংস্কৃতিকে আরো পরিচিত করে তুলবে। পদ্মা সেতুর কারণে দেশের জিডিপি বেড়ে যাবে এবং মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি পাবে। এই সেতুর কারণে দেশের দক্ষিণ পশ্চিম অঞ্চলের সাথে রেল যোগাযোগ আরো শক্তিশালী হবে। মানুষ ঢাকা থেকে অল্প সময়ে আরামদায়ক ভ্রমণ করতে পারবে।

পদ্মা সেতু হবে দেশের সৌন্দর্যের এক অনন্য নিদর্শন। স্বচ্ছ নীলাভ জলের উপর নির্মিত পদ্মা সেতু সৌন্দর্যের রাণীতে পরিণত হবে। সেতুকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে এবং দক্ষিণ পশ্চিম অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রার মান বহুগুণে বেড়ে যাবে। মোট কথা পদ্মাসেতু দেশের সার্বিক উন্নয়নে একটি মাইলফলক হিসাবে কাজ করবে। পদ্মা সেতু শেখ হাসিনার নামে না হলেও মানুষ যুগের পর যুগ ধরে জানবে এই সেতু শেখ হাসিনার কারণেই সম্ভব হয়েছে। প্রথম বছরে সেতু থেকে আয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে পৌনে ৫০০ কোটি টাকা। প্রাথমিক অবস্থায় ৮ হাজার যানবাহন প্রতিদিন চলাচল করবে। ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দে প্রতিদিন ৪১ হাজার যানবাহন চলবে সেতু দিয়ে। তিন বছরের মধ্যে সেতুর উভয় পাশে নতুন শিল্পাঞ্চল হবে এবং নতুন নতুন বাস রুট তৈরি হবে। বর্তমানে বঙ্গবন্ধু সেতু থেকে সরকার বছরে গড়ে সাড়ে ৬০০ কোটি টাকা আয় করছে। দিনে ২৪ হাজার যানবাহন চলাচল করে বঙ্গবন্ধু সেতু দিয়ে। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হয়েছে। পদ্মাসেতু দেশকে আরো দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যাবে। বাংলাদেশকে উন্নত দেশের কাতারে নিয়ে যেতে এই সেতু অনন্য ভূমিকা রাখবে। এই সেতুর সবচেয়ে বড় সুফলভোগী হবে সাধারণ জনগন। পদ্মাসেতু আমাদের জাতীয় সম্পদ। এটি শুধু দেশেই নয় সমগ্র বিশ্বের সাথে যোগাযোগের মাধ্যমে পরিণত হবে। এই সেতুকে ঘিরে অপরাজনীতির কোন সুযোগ আছে বলে মনে করি না। দেশের নিজস্ব অর্থায়নে নির্মিত এই সেতুর সঙ্গে প্রতিটি মানুষের অর্থযোগ আছে। পদ্মা সেতুকে নিয়ে পূর্ব থেকেই মাস্টার প্লান করা হয়েছে। পদ্মা সেতু প্রকল্পের মধ্যে একটি প্রাণী জাদুঘর ও বন্য প্রাণী অভয়াশ্রম নির্মাণের মহা পরিকল্পনা আছে। জাদুঘরটিতে প্রায় ৫০০ বন্য প্রাণী থাকবে। এই জাদুঘর মূলত শিক্ষার কাজে ব্যবহৃত হবে। সেতু এলাকা ঘিরে বন্য প্রাণী অভয়াশ্রম নির্মাণের কাজও চলছে। মূলত ইলিশসহ অন্যান্য জলজ প্রাণীর বিচরণ ও প্রজননের জন্য এই অভয়াশ্রম করা হচ্ছে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় প্রকল্প এলাকায় প্রচুর গাছ লাগানো হয়েছে। আমাদের এই জাতীয় সম্পদের নিরাপত্তার বিষয়টিও ভাবতে হবে। সেতুর পিলারে একাধিকবার ফেরী ধাক্কা খেয়েছে যা মোটেও কাম্য নয়। সেতুর নিচ দিয়ে কোন জাহাজ চলাচলে অবশ্যই সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। বিশ্বব্যাংক ও দাতা সংস্থার কাছে আমরা মাথা নত করিনি। নিজেদের শীর উঁচু রেখেই স্বপ্নের পদ্মা সেতু আজ বাস্তব এবং মূর্ত। পদ্মাসেতু আমাদের অহংকার, আমাদের অলংকার, আমাদের গর্ব।

কাব্যিক ভাষায় বলতে হয়—

প্রমত্তা পদ্মার নীল জলরাশি
সেই জলে সেতুটি ফুটিয়েছে হাসি
সেতুতে চড়িবে লাল নীল গাড়ি
সেই সাথে স্বপ্ন চলে যাবে বাড়ি।

কলামটির লেখক, সহকারী অধ্যাপক, বি এ এফ শাহীন কলেজ কুর্মিটোলা, ঢাকা সেনানিবাস।

লেখক: মাজহার মান্নান, কবি, প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট ।

সূত্র: দৈনিক শিক্ষা

Paris