ঢাকারবিবার , ১৯ জুন ২০২২

২২ বছর পালিয়ে ইমামতি, ‘এইডসের চিকিৎসা’ দিতেন ফাঁসির আসামি

জুন ১৯, ২০২২ ২:৫৭ অপরাহ্ণ । ১৩১ জন

গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় ৭৬ কেজি ওজনের বোমা পুঁতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টার ঘটনায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামি শেখ মো. এনামুল হক ওরফে শেখ মো. এনামুল করিমকে (৫৩) গ্রেফতার করেছে র‌্যাব। এ ঘটনায় তার জড়িত থাকার বিষয়টি প্রকাশ্যে আসলে কারি না হওয়া সত্ত্বেও কারি পরিচয়ে গাজীপুরের একটি মসজিদে ৮ বছরের বেশি সময় ইমামতি করেন।

গাজীপুরে অবস্থানকালীন এনামুল ভুয়া ঠিকানা ব্যবহার করে একটি জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরি করেন। পরে ক্যানসার নিরাময় কেন্দ্র নামে একটি প্রতিষ্ঠান খুলে ভুয়া হারবাল চিকিৎসা দেওয়া শুরু করেন। তিনি এইডস রোগ নিরাময়ে চিকিৎসা দিতে সক্ষম বলে দাবি করতেন।

রোববার (১৯ জুন) দুপুরে কারওয়ান বাজার র‌্যাব মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন র‌্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন।

তিনি বলেন, গতকাল শনিবার রাতে র‌্যাব সদর দপ্তর গোয়েন্দা শাখা ও র‌্যাব-১ এর একটি আভিযানিক দল রাজধানীর উত্তরা এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে ২০০০ সালে গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় বোমা পুঁতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টা মামলার মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামি শেখ মো. এনামুল হক ওরফে শেখ মো. এনামুল করিমকে গ্রেফতার করে।

২০০০ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর গোপালগঞ্জ জেলার কোটালীপাড়ায় জনসভার অদূরে জঙ্গি শেখ মো. এনামুল করিমসহ তার অপরাপর জঙ্গি সদস্যরা প্রধানমন্ত্রীকে হত্যার উদ্দেশ্যে ৭৬ কেজি ওজনের বোমা পুঁতে রাখার ঘটনায় কোটালীপাড়া থানায় হত্যাচেষ্টা, হত্যার ষড়যন্ত্র ও বিষ্ফোরক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে ৩টি মামলা হয়।

তদন্ত শেষে ওই মামলায় আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে ২০২১ সালের ২৩ মার্চ গ্রেফতার শেখ মো. এনামুল হক ওরফে শেখ মো. এনামুল করিমসহ ১৪ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।

কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, ব্যবসায়িক সূত্র ধরে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার অন্যতম পরিকল্পনাকারী ও তৎকালীন নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন হুজির আমির মুফতি আব্দুল হান্নানের সঙ্গে এনামুলের ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। তিনি ২০০০ সালে গোপালগঞ্জ শহরে বিসিক শিল্প নগরীতে মুফতি হান্নানের ছোট ভাই আনিসের সঙ্গে যৌথভাবে প্লট বরাদ্দ নিয়ে ‌‘সোনার বাংলা ক্যামিকেল ইন্ডাস্ট্রিজ’ নামে টুথপেস্ট, টুথপাউডার, মোমবাতি ও সাবান তৈরির একটি কারখানা প্রতিষ্ঠা করে।

মুফতি হান্নান ও অন্যান্য জঙ্গি নেতারা ২০০০ সালের জুলাই মাসে বেশ কয়েকবার তার ফ্যাক্টরি পরিদর্শন করেন। এনামুল বিভিন্ন সময়ে মুফতি হান্নানসহ অন্যান্য জঙ্গি নেতাদের সঙ্গে গোপন বৈঠক ও সমাবেশে অংশ নিতেন। এনামুল মুফতি আব্দুল হান্নানের পরিকল্পনা ও নির্দেশনা অনুযায়ী দেশের গণতান্ত্রিক সরকারকে উৎখাত করার জন্য পরস্পর যোগসাজশে প্রধানমন্ত্রী ও তার সফরসঙ্গীদের হত্যার উদ্দেশ্যে কোটালীপাড়ায় শেখ হাসিনার সভাস্থলে বোমা বিস্ফোরণের পরিকল্পনা নেয়।

এই ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নে তারা ওই কারখানায় সাবান তৈরির ক্যামিকেল সংগ্রহের আড়ালে বিভিন্ন প্রকার বিস্ফোরক দ্রব্য ও বোমা তৈরির বিভিন্ন সরঞ্জামাদি কারখানায় জমা করে লোহার ড্রামের ভেতর দুটি শক্তিশালী বোমা তৈরি করে প্রধানমন্ত্রীকে হত্যার উদ্দেশ্যে গোপালগঞ্জ জেলার কোটালীপাড়ায় জনসভার অদূরে বোমা পুঁতে রাখে।

গাজীপুরে অবস্থানকালীন একটি হোমিওপ্যাথি কলেজে দুই বছর প্রভাষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে বলে জানা যায়। একইভাবে সে নিজেকে গাজীপুর হোমিও কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ হিসেবে দাবি করত। পরে ২০১০ সালে তিনি ঢাকার উত্তরা ও বনশ্রীতে বাসা ভাড়া করে বসবাস করতে থাকে।

এনামুল উত্তরায় ২০১৫ সালে ‘আই কে হোমিও কলেজ উত্তরা’ নামে একটি ভুয়া হোমিও প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করে। পরে ২০২০ সালে ‘আই কে হোমিও কলেজ উত্তরা’ নামক প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ করে তিনি ক্যানসার নিরাময় কেন্দ্র নামে আরেকটি প্রতিষ্ঠান খুলে ভুয়া হারবাল চিকিৎসা দেওয়া শুরু করে। তার চিকিৎসায় ক্যানসার সম্পূর্ণরূপে ভালো হয় বলে তিনি দাবি করতেন। এছাড়া তিনি এইডস রোগ নিরাময়ে চিকিৎসা দিতে সক্ষম বলে দাবি করতেন।

গ্রেফতার এনামুল সবসময় নিজস্ব গন্ডির মধ্যে চিকিৎসা দিতেন। এছাড়াও তিনি নিজেকে হেপাটাইটিস-ভাইরাস, প্যারালাইসিস, ডায়াবেটিকস, মেদ, বন্ধ্যাত্ব, টিউমার, হার্ট, কিডনি, যৌন, মানসিক রোগসহ বহুবিধ রোগের সফল চিকিৎসক হিসেবে দাবি করতেন।

ডিএমপিতে বাসা ভাড়া নিতে হলে ভাড়াটিয়াকে তার পরিচয়পত্র দিতে হয় এবং একজন ফাঁসির আসামি নতুন করে ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরি করে এভাবে ২২ বছর কীভাবে পালিয়ে ছিলেন। ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরিতে সংশ্লিষ্ট কেউ জড়িত রয়েছে কি না জানতে চাইলে কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, ২০১০ সালে এনামুল ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরি করেন।

এ সময় তিনি গাজীপুরে দীর্ঘদিন ধরে থাকার কারণে তার একটি অবস্থান তৈরি করেন। সেই হিসেবে তিনি গোপালগঞ্জের পরিবর্তে গাজীপুরের ঠিকানায় স্থানীয় ঠিকানা হিসেবে এবং তার নাম এলানুম হক থেকে এনামুল করিমে পরিবর্তন করে ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরি করেন।- জাগোনিউজ

Paris