বুধবার, ফেব্রুয়ারি ৮, ২০২৩
Homeজাতীয়সুন্দরবনে ক্যামেরা ট্র্যাপিং পদ্ধতিতে বাঘ গণনা শুরু রোববার

সুন্দরবনে ক্যামেরা ট্র্যাপিং পদ্ধতিতে বাঘ গণনা শুরু রোববার

সুন্দরবনে ক্যামেরা ট্র্যাপিং-এর মাধ্যমে বাঘ গণনার কাজ শুরু হচ্ছে। রোববার (১ জানুয়ারি) সুন্দরবনের কালাবগি এলাকায় ক্যামেরা ট্র্যাপিং-এর মাধ্যমে তৃতীয়বারের মতো বাঘ জরিপ কার্যক্রমের উদ্বোধন করা হবে।

এবারই প্রথম বাঘের পাশাপাশি হরিণ ও শূকর গণনা করা হচ্ছে। এজন্য সুন্দরবনের ৬৬৫ স্পটে স্থাপন করা হচ্ছে জোড়া ক্যামেরা। বাঘ গণনার ফলাফল জানা যাবে ২০২৪ সালের জুন-জুলাইয়ে।

এদিকে শনিবার (৩১ ডিসেম্বর) খুলনা ফরেস্ট ঘাটে সুন্দরবনে ক্যামেরা ট্র্যাপিং বিষয়ক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন খুলনা সার্কেলের বন সংরক্ষক মিহির কুমার দো। এতে সভাপতিত্ব করেন সুন্দরবন বাঘ সংরক্ষণ প্রকল্প পরিচালক ও সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা ড. আবু নাসের মোহসিন হোসেন। এছাড়া বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা নির্মল কুমার পাল, সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন।

dhakapost

সুন্দরবন বাঘ সংরক্ষণ প্রকল্প পরিচালক ও সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা ড. আবু নাসের মোহসিন হোসেন বলেন, গত ১৫ ডিসেম্বর ‘সুন্দরবন বাঘ সংরক্ষণ প্রকল্প’-এর আওতায় সাতক্ষীরা রেঞ্জে বনের মধ্যে বাঘের গতিবিধি ও পায়ের ছাপ লক্ষ্য করার কাজ করা হয়েছে। ১ জানুয়ারি থেকে তৃতীয়বারের মতো ক্যামেরা ট্র্যাপিংয়ের মাধ্যমে বাঘ জরিপ করতে যাচ্ছি। এর আগে ২০১৫ এবং ২০১৮ সালে ক্যামেরার মাধ্যমে বাঘ জরিপ করা হয়েছিল। গত দুইবার খুলনা রেঞ্জ, সাতক্ষীরা রেঞ্জ এবং শরণখোলা রেঞ্জ জরিপ এলাকার আওতাভুক্ত ছিল। এবার আমরা চাঁদপাই রেঞ্জকেও অর্ন্তভুক্ত করতে যাচ্ছি। ফলে সুন্দরবনের চারটি রেঞ্জই ক্যামেরা ট্র্যাপিংয়ের আওতায় থাকবে।

তিনি আরও বলেন, সুন্দরবন অনেক বড় এলাকা। এক বছরের মধ্যে ক্যামেরা ট্র্যাপিং-এর মাধ্যমে এই কাজ করা সম্ভব না। আমাদের যে ৪৫০টি ক্যামেরা রয়েছে সেগুলো দিয়ে মার্চের মধ্যে জরিপ কাজ শেষ করা সম্ভব নয়। শুষ্ক মৌসুমে ক্যামেরাগুলো বসাতে হয়। বর্ষা মৌসুমে এই কাজগুলো করতে পারবো না। আগামী মার্চ-এপ্রিল মাস পর্যন্ত খুলনা রেঞ্জ এবং সাতক্ষীরা রেঞ্জে ক্যামেরা ট্র্যাপিংয়ের কাজ করবো। আর নভেম্বর-ডিসেম্বরে চাঁদপাই রেঞ্জ এবং শরণখোলা রেঞ্জে কাজ করবো। সব মিলিয়ে ৬৬৫টি গ্রিডে জোড়া ক্যামেরা বসানো হবে। এর মধ্যে সাতক্ষীরা রেঞ্জে ২০০টি, খুলনা রেঞ্জে ১৪০টি, শরণখোলা রেঞ্জে ১৮০টি, চাঁদপাই রেঞ্জে ১৪৫টি। প্রতিটি গ্রিডে এক জোড়া ক্যামেরা বসানো হবে। প্রতি গ্রিডে ৪০ দিন ক্যামেরা থাকবে। প্রতি ১৫ দিন অন্তর ক্যামেরার ব্যাটারি ও এসডি কার্ড পরিবর্তন করতে হবে। ক্যামেরা ট্র্যাপিংয়ের মাধ্যমে আমরা ছবি তুলবো। তারপর অ্যানালাইসিস করবো। এরপরই সংখ্যা নির্ধারণ করা হবে। ফলে ২০২৪ সালের জুন-জুলাই মাসে বাঘের সংখ্যা ঘোষণা করা সম্ভব হবে।

এই প্রকল্পের আওতায় বাঘ সংরক্ষণের কি ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, সুন্দরবনের সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে বাঘ-মানুষের দ্বন্দ্ব। এই দ্বন্দ্ব নিরসন করতে পারলে আমরা বাঘ সংরক্ষণ করতে পারব। সুন্দরবনের বাঘ-মানুষ দ্বন্দ্ব নিরসনে ৪৯টি ভিলেজ টাইগার রেন্সপন্স টিমের ৩৪০ জন সদস্য রয়েছে। ভিলেজ টাইগার রেন্সপন্স টিম, কমিউনিটি পেট্রোল গ্রুপ এবং ভিলেজ কনজারভেশন ফোরামের সবাইকে নিয়ে আমরা সচেতনতামূলক কাজ করবো। বাঘ যখন গ্রামে চলে আসবে, সেই সময়ে বাঘকে কীভাবে নিরাপদে সুন্দরবনে ফিরিয়ে নেওয়া যায় সেই ব্যাপারে কাজ করবো। এছাড়া সুন্দরবনের ধানসাগরসহ বিভিন্ন এলাকায় শুষ্ক মৌসুমে আগুন লাগে। ওই এলাকা কিন্তু বাঘের আবাসস্থল। ওই আগুন নির্বাপণের জন্য সেখানে কিছু টাওয়ার স্থাপন করা হবে। সেজন্য ফায়ার ফাইটিং যন্ত্র কেনা হবে। এই দুটি হচ্ছে মূল বিষয়। আর গত ৫ বছর ধরে সুন্দরবনে ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাস হয়েছে, তাতে দেখা যায় সুন্দরবন দুই দিন পানির নিচে থাকে। এ কারণে অভয়ারণ্য এলাকাতে ১২টি কিল্লা স্থাপন করা হবে। এখন আমরা দেখি সুন্দরবনে ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাসে বাঘ, হরিণ পুকুরের পাশে অবস্থান নেয়। ওই সময়ে বাঘ, হরিণ কিল্লাতে আশ্রয় নেবে।

তিনি আরও বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন পরিস্থিতিতে আমরা চেষ্টা করছি বাঘ এবং বাঘের শিকার করা প্রাণী কীভাবে আরও দীর্ঘদিন টিকিয়ে রাখা যায়। এই প্রকল্পের মাধ্যমে হরিণ, শূকরের সংখ্যাও নির্ণয় করার চেষ্টা করবো।

বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বাঘের হালনাগাদ তথ্য সংগ্রহ ও সুন্দরবনের বাঘ সংরক্ষণের জন্য পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় গত ২৩ মার্চ ‘সুন্দরবনের বাঘ সংরক্ষণ প্রকল্প’ শীর্ষক প্রকল্পের প্রশাসনিক অনুমোদন দেয়। প্রকল্পটির মোট ব্যয় ৩৫ কোটি ৯৩ লাখ ৮০ হাজার টাকা। এর মধ্যে শুধুমাত্র বাঘ শুমারি খাতে ব্যয় ধরা হয় ৩ কোটি ২১ লাখ টাকা। প্রকল্পটির মেয়াদ চলতি বছরের এপ্রিল থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত। ২০২২ সালের অক্টোবর মাস থেকে বাঘ গণনার কাজ শুরু করার কথা ছিল। কিন্তু প্রকল্পের অর্থ ছাড় নিয়ে জটিলতা দেখা দেয়। পরে অক্টোবরে ৩ কোটি ২১ লাখ টাকা ছাড় দেয় পরিকল্পনা কমিশন। অবশেষে ১ জানুয়ারি থেকে ক্যামেরা ট্র্যাপিংয়ের মাধ্যমে বাঘ শুমারির কাজ শুরু হচ্ছে।

উল্লেখ্য, পৃথিবীতে আইইউসিএন বাঘকে অতি সংকটাপন্ন প্রাণী হিসেবে চিহ্নিত করেছে। বর্তমানে বিশ্বের ১৩টি দেশে ৩ হাজার ৮৪০টি বাঘ রয়েছে। ২০১৫ সালে সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশে বাঘের সংখ্যা ছিল ১০৬টি। আর ২০১৮ সালের জরিপ অনুযায়ী বাঘের সংখ্যা ১১৪টি। তার মধ্যে পূর্ণ বয়স্ক ৬৩টি, ১৮টি ১২ থেকে ১৪ মাস বয়সী এবং ৩৩টি শাবক।

ঢাকা পোস্ট

সর্বশেষ সংবাদ

No posts to display