ঢাকাবুধবার , ৩১ জানুয়ারি ২০২৪
  • অন্যান্য

নজিরবিহীন চাপে মিয়ানমারের জান্তা প্রধান

জানুয়ারি ৩১, ২০২৪ ৮:৫৪ অপরাহ্ণ । ৫২ জন

গত জানুয়ারির মাঝামাঝি মিয়ানমারের এক ক্যান্টনমেন্ট শহরে ছোটো একটি জনসভা হয়েছিল। দেশটির সেনাবাহিনীপন্থি বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের অন্যতম নেতা পাউক কোতাও সেই সমাবেশে বক্তব্য দিয়েছিলেন।

নিজ বক্তব্যে এই সন্ন্যাসী ক্ষমতাসীন সামরিক সরকারের প্রধান জেনারেল মিন অং হ্লেইংয়ের উদ্দেশে আহ্বান জানিয়ে বলেন, তিনি যেন সরকারের উপপ্রধান জেনারেল সোয়ে মিনের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে বিদায় নেন। পাউক কোতাও এই আহ্বান জানানোর পর সমাবেশে উপস্থিত সবাই উল্লাসের সঙ্গে তাতে সমর্থন জানান। মিয়ানমারের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এখনও কোতাও’র বক্তব্যের ভিডিও ঘুরে বেড়াচ্ছে।

তবে কেবল পাউক কোতাওই নন, বর্তমানে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীপন্থি বেশিরভাগ সাংবাদিক, ব্লগার, ইউটিউবাররাও বিভিন্নভাবে বলছেন যে এখন সরকারপ্রধানের পদ থেকে সরে যাওয়া উচিত জেনারেল হ্লেইংয়ের।

অথচ কয়েক মাস আগেও জান্তাপন্থীদের কাছ থেকে এ ধরনের বক্তব্য কেবল অপ্রত্যাশিতই নয়, রীতিমতো অভূতপূর্ব ছিল। যার নেতৃত্বে ২০২১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি অভ্যুত্থানের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক সরকারকে হটিয়ে ক্ষমতা দখল করল জান্তা, সেই মিন অং হ্লেইংকে তারই সমর্থকরা পদত্যাগের আহ্বান জানাবেন— এমনটা কল্পনাও করা যেত না।

এখন চিত্রটি বদলে গেছে। কারণ গত কয়েক মাসে নাটকীয় উত্থান ঘটেছে জান্তাবিরোধী বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর এবং ইতোমধ্যে মিয়ানমারের ভূখণ্ডের উল্লেখযোগ্য অংশ এই গোষ্ঠীগুলোর দখলে চলে গেছে। দেশটির মিডিয়াগোষ্ঠী মিয়ানমার পিস মনিটর জানিয়েছে, গত কয়েক মাসে অন্তত ৩৫টি শহরের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী।

অন্যান্য এলাকার অবস্থাও বিশেষ ভালো নয়। বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী প্রদেশ রাখাইনসহ মিয়ানমারের বিভিন্ন অঞ্চলে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে তীব্র সংঘাত চলছে সামরিক বাহিনীর এবং তাতে বেকায়দায় রয়েছে সেনারা। সাম্প্রতিক প্রায় প্রতিটি সংঘাতেই জান্তা বাহিনী পিছু হটেছে।

সম্প্রতি চীনের উদ্যোগ ও মধ্যস্থতায় মিয়ানমার-চীন সীমান্ত অঞ্চলে যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়েছে জান্তা এবং সশস্ত্রগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে। মিয়ানমার পিস মনিটর জানিয়েছে, চুক্তির পর থেকে মিয়ানমার-চীন সীমান্ত শান্ত থাকলেও দেশটির অন্যান্য অঞ্চলের সংঘাত পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি।

বোঝার ওপর শাকের আঁটির মতো আরও একটি সংকটে ভুগছে জান্তা। সামরিক বাহিনীতে কেউ যোগ দিতে চাচ্ছে না। ফলে বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে মাঠের যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় জনবলের ভয়াবহ সংকট চলছে। এ কারণে সম্প্রতি বাহিনীর ননকমব্যাট শাখার কর্মী ও কর্মকর্তাদেরও যুদ্ধের ময়দানে আনতে হচ্ছে।

দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এখনও সামরিক বাহিনীর যে শক্তিমত্তা ও সার্বিক সক্ষমতা রয়েছে— তার ওপর ভর দিয়ে হয়তো আরও বেশ কিছুদিন সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে ঠেকিয়ে রাখা সম্ভব ছিল জান্তার জন্য; কিন্তু এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা হলো সামরিক বাহিনীর ভেতরে বাড়তে থাকা হতাশা।

মিয়ানমারে নিযুক্ত এক রাষ্ট্রদূত এ প্রসঙ্গে বার্তাসংস্থা রয়টার্সকে বলেন, ‘সামরিক বাহিনীর ভেতরে হতাশা বাড়ছে এবং সেই হতাশার কেন্দ্রে রয়েছেন মিন অং হ্লেইং। বাহিনীর মধ্যে একটি গোষ্ঠী গড়ে উঠেছে, যারা জেনারেল হ্লেইংয়ের বিদায় চাইছেন। দিন দিন এই গোষ্ঠীটির আকার বাড়ছে।’

ব্রাসেলসভিত্তিক থিংকট্যাংক সংস্থা ক্রাইসিস গ্রুপের মিয়ানমার বিষয়ক জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা রিচার্ড হোরসি বলেন, ‘২০২১ সালের অভ্যুত্থাানের পর মিয়ানমারের জনগণের একটি অংশ গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার দাবিতে আন্দোলন শুরু করলেও অপর একটি অংশ জান্তার পক্ষ নিয়েছিলেন। এ কারণে বিভিন্ন সময়ে গণতন্ত্রপন্থীদের নির্মম সমালেচানা— এমনকি আক্রমণের শিকারও হয়েছেন অনেকে।’

‘বর্তমানে জান্তাবিরোধী সশস্ত্রগোষ্ঠীগুলো একের পর এক শহর-গ্রাম দখল করে নিচ্ছে এবং স্বাভাবিক কারণেই এটি মেনে নিতে পারছেন না জান্তা সমর্থকরা। তাদের হতাশা গিয়ে পড়েছে মিন অং হ্লেইংয়ের ওপর। জান্তা সমর্থকদের অনেকেই মনে করছেন, হয়তো তিনি পদত্যাগ করলে বা সরে দাঁড়ালে পরিস্থিতির উন্নতি হবে।’

জান্তা সমর্থকদের এই হতাশাকে আরও বাড়িয়ে তুলছে ডুবতে থাকা অর্থনীতি। দশকের পর দশক ধরে সামরিক শাসকদের স্বেচ্ছাচারিতার জেরে এমনিতেই দুর্বল ছিল দেশটির অর্থনীতি, বর্তমানে তা ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে।

২০২১ সালে সামরিক বাহিনী ক্ষমতা দখলের পর কোনো নতুন আর্থিক বিনিয়োগের প্রস্তাব আসেনি মিয়ানমারে, বর‌ং যেসব বড় বিনিয়োগ ছিল— গত তিন বছরে সেগুলোর প্রায় সবই বন্ধ হয়ে গেছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং, জ্বালানি ও  নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের অগ্নিমূল্য, কর্মহীনতা ও বেকরত্ব, দারিদ্র্য প্রভৃতি সংকটে নাভিশ্বাস উঠছে সাধারণ জনগণের।

‘সামরিক বাহিনী ব্যতীত মিয়ানমারের সর্বস্তরের জনগণ বর্তমানে চলমান ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের আঁচ পাচ্ছেন,’ রয়টার্সকে বলেন রিচার্ড হোরসি।

মিয়ানমারের কারাবন্দি গণতন্ত্রপন্থী নেত্রী অং সান সুচির রাজনৈতিক দল ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসিসহ (এনএলডি) দেশটির বিভিন্ন গণতান্ত্রিক শক্তি ও রাজনৈতিক দলগুলোর জোট ন্যাশনাল ইউনিটি গভর্নমেন্ট (নাগ) বুধবার একটি বিবৃতি দিয়েছে। বিবৃতিতে জোটটির পক্ষ থেকে ৬টি শর্ত দিয়ে বলা হয়েছে, যদি সামরিক সরকার এসব শর্ত মেনে নেয়— সেক্ষেত্রে জান্তার সঙ্গে সংলাপে যেতে রাজি আছে নাগ।

এই ছয় শর্তের মধ্যে অং সান সুচি, কারাবন্দি এনএলডি নেতাকর্মী ও গণতন্ত্রপন্থী জনতার মুক্তি, সামরিক বাহিনীকে বেসামরিক সরকারের অধীনে আনা এবং রাজনীতি থেকে সামরিক বাহিনীর বিদায় নেওয়াসহ বিভিন্ন ইস্যু রয়েছে।

জান্তার কোনো মুখপাত্র থেকে এ প্রসঙ্গে এখন পর্যন্ত কোনো বিবৃতি পাওয়া যায়নি।

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক মিয়ানমার রাষ্ট্রদূত স্কট মার্সিয়েল মনে করেন, জান্তা যদি সংলাপে যেতে না চায়, সেক্ষেত্রে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর লড়াই অব্যাহত রাখাই উচিত হবে।

‘সামরিক বাহিনীর এখনও যে সক্ষমতা আছে, তাতে শিগগিরই হয়তো বিজয় আসবে না; কিন্তু মনে রাখার প্রয়োজন যে জান্তার যাবতীয় সক্ষমতা এখন ক্ষয়িষ্ণু পর্যায়ে রয়েছে। তাদের নেতৃত্বের আদর্শগত অবস্থানও দিন দিন দুর্বল হচ্ছে।’

‘তাই সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সুযোগ রয়েছে। যদি তাদের তৎপরতা জারি রাখে…হয়তো সময় নেবে, কিন্তু সুদিন আসবে ঠিকই।’

সূত্র : রয়টার্স ও ঢাকা পোস্ট