ঢাকাসোমবার , ৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪
  • অন্যান্য

ইসরাইলের পক্ষে সংবাদ প্রচার করছে সিএনএন: দ্য গার্ডিয়ানের অনুসন্ধান

ফেব্রুয়ারি ৫, ২০২৪ ১০:০৫ অপরাহ্ণ । ৬০ জন

মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের বিরুদ্ধে গাজা যুদ্ধ নিয়ে ইসরাইলি প্রোপাগান্ডা প্রচার এবং ফিলিস্তিনিদের অবস্থান তুলে ধরার ক্ষেত্রে সেন্সরশিপ আরোপের অভিযোগ উঠেছে।

এমন সম্পাদকীয় নীতির সমালোচনা করেছেন খোদ সংবাদমাধ্যমটির কর্মীরাই।

যুক্তরাষ্ট্র ও বিভিন্ন দেশে সিএনএন বার্তা কক্ষের কর্মীদের অভিযোগ, ওপর মহলের চাপিয়ে দেওয়া নির্দেশনা ও প্রতিবেদনের অনুমোদন প্রক্রিয়ার কারণে ৭ অক্টোবর হামাসের হত্যাযজ্ঞ ও জবাবে গাজায় ইসরাইলি হামলা নিয়ে তীব্র পক্ষপাতমূলক সংবাদ প্রচার করা হচ্ছে।

রোববার (৪ ফেব্রুয়ারি) ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

এ বিষয়ে এক সিএনএন কর্মী বলেছেন, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই অধিকাংশ খবর, প্রাথমিক প্রতিবেদন যতই নির্ভুল হোক না কেন তা পক্ষপাতদুষ্ট হয়েছে। এর কারণ হলো, আমাদের নেটওয়ার্কে ইসরাইলের প্রতি একটি পদ্ধতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক পক্ষপাতিত্ব রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, মোটের ওপর ইসরাইল-গাজা যুদ্ধ নিয়ে সিএনএন-এর কাভারেজ সাংবাদিকতার অপব্যবহারেরই সমান। একাধিক নিউজরুমের ছয় কর্মীর বক্তব্য, এক ডজনেরও বেশি অভ্যন্তরীণ মেমো এবং ই-মেইল হাতে পেয়েছে দ্য গার্ডিয়ান। এগুলোর ভিত্তিতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে- আটলান্টায় সিএনএনের সদর দফতর থেকে দিনের সংবাদের ওপর একাধিক নির্দেশনা আসে। এ কঠোর নির্দেশনাগুলো সংবাদ কাভারেজের ওপর প্রভাব ফেলে।

এসব নির্দেশনার মধ্যে হামাসকে উদ্ধৃত করা এবং ফিলিস্তিনিদের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে প্রতিবেদন করার ক্ষেত্রে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। যদিও ইসরাইল সরকারের বিবৃতিগুলোকে ঠিকই যথাযথভাবে প্রকাশ করার জন্য তাগিদ দেওয়া হয়। এর মধ্যে আবার গাজা সংঘাত নিয়ে করা প্রতিটি প্রতিবেদন সম্প্রচার বা প্রকাশের আগে সংবাদমাধ্যমটির জেরুজালেম ব্যুরোর অনুমোদন নিতে হয়।

সিএনএন-এর সাংবাদিকরা বলছেন, খবরে এই পক্ষপাতমূলক অবস্থান নির্ধারণের ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছেন তাদের নতুন এডিটর-ইন-চিফ এবং সিইও মার্ক থম্পসন। ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার দুই দিন পর তিনি এই পদে দায়িত্ব পালন শুরু করেন। নিজেদের কাভারেজে বাইরের প্রভাব ঠেকানোর বিষয়ে থম্পসনের সদিচ্ছা নিয়ে সন্দিহান কয়েকজন কর্মী। কেননা, বিবিসির মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তার বিরুদ্ধে ইসরাইলি সরকারের চাপের কাছে বিভিন্ন সময় মাথা নত করার অভিযোগ রয়েছে। এর অন্যতম উদাহরণ, ২০০৫ সালে ইসরাইল সরকারের কথায় জেরুজালেমে বিবিসির এক রিপোর্টারকে তার পদ থেকে অপসারণ করেন থম্পসন।

সিএনএন-এ কর্মরত ব্যক্তিরা বলছেন, এ কারণেই যুদ্ধের প্রথম সপ্তাহগুলোতে, হামাসের হামলার শিকার হিসেবে ইসরাইলিদের কষ্ট ও দুর্ভোগের কথাই তাদের প্রতিবেদনে বিশেষ স্থান পেয়েছে। তখন সংবাদমাধ্যমটির প্রতিটি প্রতিবেদনে যুদ্ধে ইসরাইলি আখ্যানের ওপর মনোযোগ দেওয়া হয়েছে। গাজায় ইসরাইলি সেনাদের চালানো ধ্বংসযজ্ঞ এবং তাদের হাতে ফিলিস্তিনি বেসামরিকদের মৃত্যুর মাত্রা বৃদ্ধির মতো বিষয়গুলো নেটওয়ার্কটির কাভারেজে কোনও গুরুত্ব পায়নি।

সিএনএন-এর কয়েকজন সাংবাদিক বলেছেন, সাংবাদিকদের মধ্যে ‘একাধিক বিরোধ ও ভিন্নমত দেখা দিয়েছে। কিছু মানুষ এখান থেকে বের হতে চাইছেন।’ ভিন্ন ব্যুরোর আরেক সাংবাদিক বলেছেন, তারাও এমন কিছুই ভাবতে বাধ্য হচ্ছেন।

তারা আরও বলেছেন, বৈঠকে সিএনএন-এর নীতির সঙ্গে একমত নন এমন সিনিয়র কর্মীরা আদেশ প্রদানকারী নির্বাহী কর্মকর্তাদের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলেছেন। তারা প্রশ্ন তুলেছেন, এমন বিধিনিষেধমূলক নির্দেশনা থাকলে কীভাবে একটি প্রতিবেদনকে কার্যকরভাবে তুলে ধরা সম্ভব?

তারা আরও বলেছেন, সম্প্রচারের জন্য গাজা থেকে আরও প্রতিবেদনের জন্য চাপ দিচ্ছেন অনেকেই। তবে এই প্রতিবেদনগুলো যখন জেরুজালেম হয়ে টিভি বা হোমপেজে প্রচারিত হয়, তখন সেগুলো আর আগের মতো থাকে না। প্রচারিত সেসব কাভারেজে অশুদ্ধ ভাষার ব্যবহার থেকে শুরু করে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোর প্রতি বিশেষ অবহেলা করা হয়। ফলে অপরাধ যত গুরুতরই হোক না কেন, এ রকম প্রতিটি প্রতিবেদন ইসরাইলকে দায় থেকে মুক্ত করে দিচ্ছে।

সিএনএন কর্মীরা আরও জানিয়েছেন, সংঘাতের খবর সংগ্রহ ও মধ্যপ্রাচ্যে কাজের অভিজ্ঞতা থাকা কয়েকজন সাংবাদিক এবার প্রতিবেদন পাঠানো এড়িয়ে যাচ্ছেন। কারণ তারা মনে করছেন, স্বাধীনভাবে পুরো বিষয় তুলে ধরতে পারবেন না। তবে অনেকেই ধারণা করছেন, জ্যেষ্ঠ সম্পাদকরা বুঝি তাদের সুযোগ দিচ্ছিলেন না।

সিএনএনের এক অভ্যন্তরীণ কর্মী বলেছেন, ‘এটা স্পষ্ট যে যোগ্যরা নয়, বরং অযোগ্যরাই এই যুদ্ধের খবর পাঠাচ্ছেন।’

চলমান সংঘাত নিয়ে সিএনএনের কাভারেজকে ‘দুর্দান্ত’ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন থম্পসন। ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার দুদিন পর সম্পাদকদের সঙ্গে তার প্রথম সভায় এমন মন্তব্য করেছিলেন তিনি।

থম্পসন তখন বলেছিলেন, তিনি দর্শকদের জানাতে চান হামাস কী, এটি কীসের পক্ষে দাঁড়িয়েছে এবং এই আক্রমণের মাধ্যমে ঠিক কী অর্জন করার চেষ্টা করছে। বৈঠকে উপস্থিতদের মধ্যে কেউ কেউ একে প্রশংসনীয় সাংবাদিকতার লক্ষ্য ভেবেছিলেন। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের ভুল ভাঙতে থাকে। সাংবাদিকদের কীভাবে এই সশস্ত্র গ্রুপটির খবর প্রচার করতে হবে, তা নিয়ে থম্পসনের আরও সুনির্দিষ্ট প্রত্যাশার বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল।

দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অক্টোবরের শেষদিকে গাজায় ইসরায়েলি অভিযানে ফিলিস্তিনিদের নিহতের সংখ্যা বাড়তে থাকলে এবং স্থল অভিযানের প্রস্তুতির সময় আবার নতুন নির্দেশনা আসে কর্মীদের কাছে। নির্দেশনায় স্পষ্ট করে বলে দেওয়া হয়েছে, এই বিষয়ক প্রতিবেদনগুলোতে দর্শকদের বারবার মনে করিয়ে দিতে হবে যে হামাসের হামলা ও বেসামরিকদের জিম্মি করার কারণেই এই মানবিক পরিণতি।

সিএনএন কর্মীরা বলছেন, এই নির্দেশনা তাদের প্রতিবেদনগুলোর একটা কাঠামো দাঁড় করিয়ে দেয়। আর এতে ইসরাইলি কর্মকাণ্ডকে ন্যায্যতা দেওয়া হয়েছে হামাসের হত্যাযজ্ঞের কথা তুলে ধরে। এক্ষেত্রে অন্যান্য দৃষ্টিভঙ্গি বা ইতিহাসকে আমলে নেওয়া হয়নি। ইসরাইলিরা যা-ই করুক না কেন, দায় শুধু হামাসের।

নভেম্বরের শুরুতে আরেকটি নির্দেশনায় হামাসের বক্তব্য প্রচারে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। এতে বলা হয়, হামাসের বক্তব্য উসকানিমূলক বাগাড়ম্বর ও প্রোপাগান্ডা। এগুলোর সংবাদমূল্য নেই। তাদের বক্তব্য প্রচারের মঞ্চ দেওয়া উচিত না। বৃহত্তর পটভূমিতে–প্যাকেজ বা ডিজিটাল খবরে– স্থান দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু এককভাবে কোনো উদ্ধৃতি বা সাউন্ড বাইট থাকবে না।

তবে সিএনএন কর্মীরা উল্লেখ করেছেন, বিপরীতে ইসরাইলি কর্মকর্তা ও মার্কিন সমর্থকদের উসকানিমূলক বক্তব্য ও প্রোপাগান্ডা প্রায় সময় সাক্ষাৎকারে চ্যালেঞ্জ করা ছাড়াই প্রচার করা হয়েছে।

সিএনএন সূত্র স্বীকার করেছে, ৭ অক্টোবরের হামলার পর কোনো হামাস নেতার সাক্ষাৎকার সংবাদমাধ্যমটিতে প্রচার হয়নি। এমন সাক্ষাৎকার প্রচারে নির্দিষ্টভাবে কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই; কিন্তু বার্তা কক্ষ ও রিপোর্টারদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, উচ্চতর কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়া কোনো অবস্থাতেই হামাসের রেকর্ডকৃত ভিডিও রাখা যাবে না।

সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণ ও সেন্সরশিপ ছাড়া ইসরাইল গাজা উপত্যকায় বিদেশি সাংবাদিকদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করলে ভারসাম্যপূর্ণ সংবাদ প্রচারের চেষ্টা বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এর ফলে যুদ্ধের প্রভাবের খবর প্রচারে ফিলিস্তিনিরা বাদ পড়ে এবং ইসরাইলি দৃষ্টিভঙ্গির প্রচার নিশ্চিত হয়।

সিএনএনের মুখপাত্র এমন পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি বলেছেন, আমাদের প্রতিবেদনগুলোতে ইসরাইলি পদক্ষেপকে প্রশ্ন তোলা হয়েছে উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত, সাক্ষাৎকার ও প্রতিবেদনের মাধ্যমে।

২০০১ সালে ৯/১১ হামলার পরও সিএনএনের বিরুদ্ধে এমন পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ উঠেছিল।

যুগান্তর