১৪ October ২০২৬
বিজ্ঞাপন
Greencity24

পুলিশের তালিকাভুক্ত ছিনতাইকারী মাদককারবারি রাসিক কাউন্সিলরপ্রার্থী

প্রকাশিত: ১৩ June ২০২৩, ৪:৫৮ pm | বিভাগ: রাজশাহী, রাজশাহী প্রতিদিন, সব খবর
পুলিশের তালিকাভুক্ত ছিনতাইকারী মাদককারবারি রাসিক কাউন্সিলরপ্রার্থী
বিজ্ঞাপন

পুলিশের তালিকায় তিনি ছিনতাইকারী ও মাদককারবারি। খাসজমি ও বাড়িদখলেও পটু। মাদকের কারবার থেকেই তার উত্থান। বিত্তবৈভবের কমতি নেই। নিজের নামে ছাড়াও আত্মীয়স্বজনের নামে করেছেন অঢেল সম্পদ। শূন্য থেকে এখন তিনি বিলাসবহুল ফ্ল্যাটের মালিক। চড়েন দামি গাড়িতে। তার আলিশান চলাফেরায় বিস্ময় জাগলেও ভয়ে মুখ খুলতে চান না স্থানীয়রা। তিনি আসন্ন সিটি করপোরেন নির্বাচনে ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদে প্রার্থী হয়েছেন। যার উত্থানে সবার মনেই এত বিস্ময়, তিনি হলেনÑ মেহেদী হাসান রনি। রনি রাজশাহী মহানগরীর ২৩ নম্বর ওয়ার্ড থেকে নির্বাচন করছেন। তিনি ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকও। এই রনিই ছিনতাইকারী থেকে এখন জনপ্রতিনিধি হতে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন নির্বাচনী মাঠ।

স্থানীয়রা জানান, মহানগরীর শেখেরচক এলাকার বাসিন্দা মেহেদী হাসান রনির বাবা আবুল হোসেন। রনির মা জ্যোৎস্না বেগম গৃহকর্মীর কাজ করতেন। মেহেদী হাসান রনি একসময় ছিনতাইকারী ও ছিচকে চোর ছিলেন। মোটরসাইকেল ও টিভি চুরির অভিযোগও আছে তার বিরুদ্ধে। ২০০৫ সালের ৫ সেপ্টেম্বর মহানগরীর তেরখাদিয়া এলাকায় একটি মোবাইল ছিনতাইয়ের অভিযোগে মেহেদী হাসান রনিসহ দুজনের বিরুদ্ধে মামলা হয়। ওই মামলার বাদী চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদরের ঘোড়াপাখিয়া গ্রামের আসাদুজ্জামান পলাশ নামে এক ব্যক্তি। আরএমপির রাজপাড়া থানার এফআইআর নং-৫। ২০১৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর থার্টিফার্স্ট নাইটের নামে রনি তার নিজ এলাকায় ২৩ নম্বর ওয়ার্ডের বোসপাড়ার একটি বাড়িতে মাদকের আসর বসায়। ওই রাতেই বোয়ালিয়া মডেল থানাপুলিশ অভিযান চালিয়ে মেহেদী হাসান রনি, মোস্তাফিজুর রহমান রোমেল, মনিরুল হক, রিপন আলীসহ তিন নারীকে আটক করে। এ সময় ওই আসর থেকে মদ, ইয়াবা ও অ্যালকোহল জব্দ করা হয়। এ মামলায় রনি এক নম্বর

আসামি। মামলটি আদালতে চলমান। বোয়ালিয়া থানার এফআইআর নং-১১০। কিন্তু রনির বিরুদ্ধে দলীয় কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

এলাকাবাসী আরও জানান, ২৩ নম্বর ওয়ার্ড যুবদল সভাপতি প্রয়াত নান্নুর শ্যালক রনি। রনি আওয়ামী লীগের সক্রিয় রাজনীতি করার আগে নান্নুর হাত ধরেই বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নানা কর্মসূচিতে যোগ দিতেন। সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর বিএনপি নেতা বজলুল হক মন্টুরও আস্থাভাজন কর্মী ছিলেন। পরে ২০১৩ সালে মন্টু সিটি নির্বাচনে হেরে গেলে ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মাহাতাব হোসেন চৌধুরী কাউন্সিলর হন। তখন মন্টুকে ছেড়ে রনি মাহাতাবের দলে ভেড়েন। মাহাতাবের হাত ধরেই ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক হন রনি। এর পর ২০১৪ সালে রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগের কমিটি শ্রমবিষয়ক সম্পাদকের পদ পান মাহাতাব। এতে ২৩ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের পদ শূন্য হয়। এ সময় রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ডাবলু সরকারের আশীর্বাদে রনি ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকের দায়িত্ব পান। দলের পদ বাগিয়েই বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। পরে ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পদক হন। খাসজমি ও বাড়িদখল, নির্মাণাধীন ভবনে চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসাসহ অভিযোগ উঠে তার বিরুদ্ধে। ২০১৯ সালে থার্টিফার্স্ট নাইটে মাদক ও নারীসহ আটক হলে রনিকে ছাড়িয়ে নিতে থানায় তদবির করেন আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা ডাবলু সরকার। রনি ২০২১-২২ মেয়াদে তার এলাকার শাহ মখদুম কলেজের গভর্নিং বডির সদস্য ছিলেন। এ সময় প্রভাব খাটিয়ে তিনি তার ভাই শাহাদাত হোসেন জনিকে ওই কলেজে ল্যাব অ্যাটেন্ড্যান্ট পদে চাকরিও দিয়েছেন। রনির আরেক ভাই আবুল কালাম আজাদ (৬২) চিহ্নিত মাদককারবারি। গত ৭ মে নগরীর ২৩ নম্বর ওয়ার্ড বাগানপাড়া এলাকা থেকে তাকে হেরোইনসহ আটক করে বোয়ালিয়া মডেল থানাপুলিশ। আজাদ এখনো কারাগারে।

পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছে, রনির উত্থানই হয় মাদক কারবারের মাধ্যমে। কয়েক বছর আগে চট্টগ্রাম থেকে ইয়াবার চালান রাজশাহীতে আনার পথে কুমিল্লায় পলাশ নামে এক ব্যক্তি পুলিশের হাতে ধরা পড়ে। পুলিশের কাছে পলাশ জানিয়েছিল, ইয়াবার চালানটি রনির। রনির এলাকাতে বাড়ি পলাশের। জিল্লুর নামে এক ব্যক্তির মাধ্যমে মাদকের কারবার করতেন রনি। তবে ইয়াবার টাকা লেনদেন নিয়ে তাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব বাঁধে।

স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও আওয়ামী লীগ নেতা মাহাতাব হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘উপশহরে মোটরসাইকেল চুরির অভিযোগে গণধোলাই খেয়েছিল রনি। সে ২৪ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর কার্যালয়ের টিভিও চুরি করেছিল। মাদক, চোর ও ছিনতাইকারী হিসেবে পরিচিত। সে নওদাপাড়া বাসস্ট্যান্ডে মেলায় জুয়ার বোর্ড চালাত।

স্থানীয় আওয়ামী লীগের একাধিক নেতাকর্মী জানিয়েছেন, বোসপাড়া এলাকায় রনির বাড়ির সামনে রাজশাহীর আলোচিত আমানা গ্রুপের মালিকানায় ‘আমানা মোরশেদ’ নামে একটি বহুতল ভবন নির্মাণের কাজ শুরু হয়। মেহেদী হাসান রনি তার দলবল নিয়ে গিয়ে ভবন নির্মাণে বাধা দেন ও ভয়ভীতি দেখান। পরে আমানা কর্তৃপক্ষকে তার মাধ্যমে নির্মাণসামগ্রী কিনতে বাধ্য করেন রনি। পরে এ ভবনেই একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাটের (৯/এ) মালিক হয়েছেন রনি।

মহানগরীর ২৩ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা জহিরুল ইসলাম জসি ‘আমাদের সময়’কে বলেন, রনির মাদক কারবারের কথা জানা নেই। তবে আমানা মোরশেদ বিল্ডিং নির্মাণের সময় রনি নির্মাণসামগ্রী সরবরাহ করেছেন। তার নিজস্ব কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নেই। মিডিয়া হয়ে দোকানদারের কাছ থেকে মালামাল কিনে সরবরাহ করেছেন। তখন থেকেই তাদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি হয়। রনি এখন আমানা হোমসের পরিচালক।

আমানা হোমস লিমিটেডের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মাসুদুল হকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে বলেন, ‘রনির অতীত সম্পর্কে আমাদের জানা নেই। তিনি আমাদের প্রজেক্টে নির্মাণসামগ্রী সররবরাহ করেছিলেন। পরে তিনি মালিকানার জন্য শেয়ার কেনেন। এখন তিনি পরিচালক। প্রতিষ্ঠান থেকে মাসিক সম্মানী পান’।

মেহেদী হাসান রনির সম্পর্কে রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক আহসানুল হক পিন্টু বলেন, ‘রনির চুরি-ছিনতাই বা মাদক কারবারের বিষয়ে কেউ কখনো অভিযোগ করেনি। আর সন্ত্রাসী বা মাদককারবারি কোনো দলের হতে পারে না। এ ধরনের অভিযোগ পেলে দল গঠনতন্ত্র অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে।

তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করে মেহেদী হাসান রনি বলেন, ‘ভোটে প্রার্থী হওয়ার কারণে প্রতিপক্ষ এসব দুর্নাম ছড়াচ্ছে। আমার বিরুদ্ধে মোবাইল ছিনতাই ও মাদক মামলা দুটিই মিথ্যে। আমার কোনো অবৈধ আয় নেই’। আমাদের সময়

পাঠকদের ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন