রাসিক নির্বাচন: ভোট উৎসবমুখর করতে ভরসা কাউন্সিলর প্রার্থীরাই
রাজশাহী সিটি করপোরেশন (রাসিক) নির্বাচন কাল। ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে প্রচার। নির্বাচনে মেয়র পদে বিএনপির প্রার্থী নেই। শুরুতে নির্বাচনে থাকলেও ইসলামী আন্দোলনের মেয়র প্রার্থী মুরশিদ আলমও ভোট বয়কট করেছেন। জাতীয় পার্টির সাইফুল ইসলাম স্বপন ও জাকের পার্টির লতিফ আনোয়ার মাঠে আছেন। তবে আওয়ামী লীগের প্রার্থী এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটনের সঙ্গে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। মেয়র পদে অসম লড়াইয়ের আভাসে নির্বাচনে মেয়র নিয়ে ভোটারদের আগ্রহ কম। ফলে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই শহরের ভোট কতটা উৎসবমুখর হয়, কত শতাংশ ভোট পড়ে তা নিয়ে চলছে নানা আলোচনা। ভোট উৎসবমুখর করতে এখন ভরসা কাউন্সিলর প্রার্থীরাই।
রাসিক নির্বাচনে ২০নং ওয়ার্ডে মাত্র একজন প্রার্থী থাকায় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় তিনি কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছেন। বাকি ২৯টি ওয়ার্ডের সাধারণ আসনে কাউন্সিলর পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ১১১ প্রার্থী। কাউন্সিলর পদে প্রতিটি ওয়ার্ডেই শক্ত লড়াই হবে। অনেক ওয়ার্ডেই আওয়ামী লীগের একাধিক প্রার্থী আছেন। বিএনপি নির্বাচনে অংশ না নিলেও দলীয় সিদ্ধান্ত ভেঙে তাদের ১৬ জন কাউন্সিলর প্রার্থী হয়েছেন। আবার জামায়াত, ওয়ার্কার্স পার্টিসহ অন্যান্য দলের নেতারাও কাউন্সিলর নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন। এ ছাড়া সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর প্রার্থীরাও রয়েছেন মাঠে। ফলে ভোটার উপস্থিতি বাড়িয়ে তারাই মূলত রাজশাহী সিটি নির্বাচনের ভোটকে উৎসবমুখর করবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
নির্বাচন বিশ্লেষকরা বলছেন, মেয়র পদে কে জয়ী হবে তা এখন আর বলার অপেক্ষা রাখে না। মেয়র প্রার্থী লিটনের যে ভাবমূর্তি (মেয়র থাকাকালে সিটির অবকাঠামোগত উন্নয়নের কারণে) ও প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী না থাকায় তিনি সহজেই জয়লাভ করবেন। তবে নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হলে যত ভোট পড়ত সেই ভোট হয়তো হবে না। তবে ওয়ার্ড কাউন্সিলর প্রার্থীর কারণে স্থানীয় বা পাড়ার ভোটের কারণে ভোটাররা ভোট দিতে যাবে। যেহেতু বিভিন্ন দলের কাউন্সিলর প্রার্থীরা ভোট করছেন। তারা নিজেদের প্রতিবেশী, ভাইবোন, আত্মীয়স্বজনকে ভোটকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবে। সেই সুযোগে তারা মেয়রের ভোটটিও দেবে। সবকিছু বিবেচনায় ভোট খুব একটা খারাপ হবে বলে মনে হয় না।
জানতে চাইলে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) রাজশাহীর সভাপতি আহমদ সফিউদ্দিন বলেন, মেয়র নির্বাচনটা অনেকটাই নিরুত্তাপ। তবে কাউন্সিলর নির্বাচন ঘিরে কয়েক দিন ধরেই পাড়ায় পাড়ায় আমরা দেখছি উৎসবের নগরী। তারা নানাভাবে প্রচারও চালিয়েছে। নির্বাচনটা প্রতিন্দ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে বলেই মনে হচ্ছে। কিছু ওয়ার্ডে বিএনপি, কিছু ওয়ার্ডে জামায়াতের প্রার্থীরাও কিন্তু আছেন। আবার আওয়ামী লীগের মধ্যেও একাধিক প্রার্থী রয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, নির্বাচন বেশিরভাগই শান্তিপূর্ণ তবে কয়েকটি জায়গায় কিছু শঙ্কা রয়েছে। কারও কারও কালো টাকা রয়েছে। মাদকের ব্যবসার অভিযোগও রয়েছে। মামলাও আছে। এগুলো নিয়ে কিছু ঝুঁকি আছে। এটা শুধু আমার কথা নয়। এটা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও সম্ভবত বলছে। তবে সার্বিক দিক বিবেচনায় ভোটের পরিবেশ ভালো জানিয়ে তিনি বলেন, আমরা আশা করি একটা সুন্দর ও ভালো নির্বাচন হবে। যদি প্রশাসন কঠোর থাকে, তাহলেই সেটা হবে।
বিএনপিসহ অন্য বড় দলগুলো নির্বাচনের মাঠে না থাকায় ভোটার উপস্থিতি নিয়ে সবার মধ্যেই ধোঁয়াশা রয়েছে। সুষ্ঠু ভোটের পরিবেশ না থাকার অভিযোগ এনে জাতীয় পার্টির মেয়রপ্রার্থী সাইফুল ইসলাম স্বপন বলেছেন, ফলাফলের বিষয়ে ভোটাররা নিশ্চিত হয়ে গেছেন। তাই ভোট নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে উৎসাহ নেই। ফলে নির্বাচনে কত শতাংশ ভোট পড়বে তা নিয়ে শঙ্কা সবার মধ্যেই। জাতীয় পার্টির প্রার্থীর ধারণা, ৩০ শতাংশের বেশি ভোটারকে কেন্দ্রে পাওয়া যাবে না। তবে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রার্থী বলছেন, ভোট পড়বে ৬০ শতাংশের ওপরে। অন্যদিকে নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, ভোটার উপস্থিতি বাড়াতে ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে গম্ভীরা গানসহ নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সোমবার সংবাদ সম্মেলনে ভোটারদের কেন্দ্রে আসার আহ্বান জানিয়ে খায়রুজ্জামান লিটন বলেন, খুশি হতাম এখানে বিএনপিসহ সব দলই যদি নির্বাচনে অংশ নিত। কিন্তু নানাভাবে তাদের অনুরোধ করার পরও নানা শর্ত আরোপ করে বর্জন করেছে। তবে বিএনপি ও জামায়াতের অনেক কাউন্সিলর প্রার্থী আছেন।
এদিকে নির্বাচনে ১৫৫টি ভোটকেন্দ্রের ১৪৮টিকেই ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করা হয়েছে। কাউন্সির প্রার্থীরা একদিকে যেমন ভোটকে উৎসবমুখর করছেন অন্যদিকে শান্তিপূর্ণ ভোটে শঙ্কাও তাদের নিয়েই। প্রায় প্রতিটি ওয়ার্ডেই কাউন্সিলর প্রার্থী ও তাদের সমর্থকরা বিরোধে লিপ্ত হচ্ছেন। পাড়া-মহল্লায় দ্বন্দ্ব ও সংঘাতের ঘটনাও ঘটছে। প্রার্থী ও তাদের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে হানাহানিতে বেশ কিছু ওয়ার্ডে উত্তপ্ত পরিস্থিতি বিরাজ করছে। রাসিকের ৩০টি সাধারণ ওয়ার্ডের ১৯টিতে কাউন্সিলর পদে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের অর্ধশতাধিক নেতা-কর্মী পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হওয়ায় এই উত্তাপ আরও বেড়েছে।
প্রসঙ্গত, নির্বাচনে সাধারণ ৩০টি ওয়ার্ডে কাউন্সিলর প্রার্থী ১১২ জন। আর সংরক্ষিত নারী আসনের ১০টি ওয়ার্ডে ৪৬ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। রাসিকে এবার ৩ লাখ ৫১ হাজার ৯৮২ জন ভোটার ভোট দেবেন। এর মধ্যে নতুন ভোটার ৩০ হাজার ১৫৭ জন। পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৭১ হাজার ১৬৭ জন, নারী ১ লাখ ৮০ হাজার ৮০৯ জন ও তৃতীয় লিঙ্গের (হিজরা) ভোটার ৬ জন।
যুগান্তর
