৪৮৮ কোটি টাকা ঋণ পেতে ১৫০ কোটি ঘুষ
ঋণ-আমানত নীতিমালা লঙ্ঘন করে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ ও আর্থিক প্রতিবেদনে মিথ্যা তথ্য উপস্থাপন করে ১৫০ কোটি টাকার বেশি আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক (রাকাব) কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে।
ব্যাংকটির রংপুর জেলার পীরগঞ্জ শাখার গ্রাহক শাহ ইসমাইল গাজী (রহ.) কোল্ড স্টোরেজ ও নওগাঁ জেলার প্রসাদপুর শাখার জ্যোতি কোল্ড স্টোরেজ প্রাইভেট লিমিটেডের অনুকূলে এসব ঋণ বিতরণ করা হয়েছিল। ২০১২ সালে প্রতিষ্ঠান দুটিকে দেওয়া ঋণের এক টাকাও তারা পরিশোধ করেনি। রোববার (১১ সেপ্টেম্বর) দেশ রুপান্তর পত্রিকায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা যায়। প্রতিবেদনটি লিখেছেন শাহেদ আলী ইরশাদ।
এরপর যোগাযোগ করা হয় ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. জাহিদুল হকের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমি নতুন যোগদান করেছি। হালনাগাদ কোনো তথ্য আমার কাছে নেই। খোঁজ নিয়ে জানাতে পারব।’
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ঋণের টাকা আদায়ে অর্থঋণ আদালতে মামলা করেছে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। জ্যোতি কোল্ড স্টোরেজ প্রাইভেট লিমিটেডের বিরুদ্ধে করা মামলার রায় হয়েছে ব্যাংকের পক্ষে। অর্থাৎ রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক এখন জ্যোতি কোল্ড স্টোরেজের বন্ধকী সম্পত্তি নিলামে বিক্রি করে দেবে। আর শাহ ইসমাইল গাজী (রহ.) কোল্ড স্টোরেজ লিমিটেডের বিরুদ্ধে অর্থঋণ আদালতে মামলা বিচারাধীন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা লঙ্ঘন করে ঋণ বিতরণ ও আত্মসাতের বিষয়টি নজরে আসার পর তদন্ত শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সম্প্রতি দুদক রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে চিঠি পাঠিয়ে কোল্ড স্টোরেজ দুটির অনুকূলে প্রথম ঋণ প্রস্তাবের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার নাম পদবি ও বর্তমান কর্মস্থলসহ যোগাযোগের প্রয়োজনীয় তথ্য চেয়েছে। একই সঙ্গে এসব ঋণসংক্রান্ত হিসাব খোলার ফরম, কেওয়াইসি, এসএস কার্ড এবং হিসাব বিবরণী, ঋণ বিতরণসংক্রান্ত আবেদন, শাখার প্রস্তাব, নোট, অনুমোদনপত্র জামানত, ডেবিট-ক্রেডিট ভাউচারের কপি, ব্যাংক ও তৃতীয় পক্ষের জামানত মূল্যায়নের প্রতিবেদন চেয়েছে।
রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের আগস্ট শেষে ব্যাংকটির মোট আমানত প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকার বেশি। এ আমানতের বিপরীতে তারা ঋণ বিতরণ করেছে ৬ হাজার ২০০ কোটি টাকা, যা বাংলাদেশ ব্যাংক নির্ধারিত ঋণ-আমানত অনুপাতের তুলনায় বেশি। এখনো ঋণ বিতরণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা মানছে না রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক। ব্যাংকটির মূলধন ঘাটতির পরিমাণ ২ হাজার ২০০ কোটি টাকা।
পরিমাণ ১ হাজার ৭৫৫ কোটি ৯৫ লাখ টাকা, যা মোট ঋণের ৩০ দশমিক ৮০ শতাংশ। এর মধ্যে মন্দ ঋণের পরিমাণ ১ হাজার ২১০ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। চলতি বছরের জানুয়ারি-জুন পর্যন্ত অবলোপন করা হয়েছে ১৬৫ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। বর্তমানে ব্যাংকটির মূলধন পর্যাপ্ততা, সম্পদের গুণগতমান, ব্যবস্থাপনা, উপার্জন ক্ষমতার মান অসন্তোষজনক।
নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে পদোন্নতিও দেওয়া হয়েছে ব্যাংকটিতে। বিষয়টি উঠে এসেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলেছে, নীতিমালার ব্যত্যয় ঘটিয়ে রাজশাহীর প্রধান কার্যালয় ও ঢাকা কার্যালয়ে কিছু কর্মকর্তাকে পদোন্নতি ও পদায়ন করা হয়েছে। অনেক কর্মকর্তা ৩ থেকে ১২ বছরেরও বেশি সময় একই কর্মস্থলে কর্মরত রয়েছেন। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা হিসেবে চাকরিকাল ৩ বছরের বেশি ও ৫ বছরের কম হলেও পদোন্নতির জন্য বিবেচনা করা হয়নি। আবার সরাসরি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা হিসেবে নতুন যোগদানকৃত কর্মকর্তার চাকরিকাল সাড়ে ৪ বছর হওয়ার পরও পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে, যা পদোন্নতি বিধিমালার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
রাকাবে নীতিমালা লঙ্ঘন করে পদোন্নতির সঙ্গে জড়িত চেয়ারম্যানের তৎকালীন ব্যক্তিগত কর্মকর্তাসহ প্রধান কার্যালয়ের ১১ জন ও ঢাকার ব্যবস্থাপকসহ ৪ জন কর্মকর্তা। বাংলাদেশ ব্যাংক পদোন্নতির সুপারিশ করে প্রায় একশ জনের একটি তালিকা দিয়েছিল। যাদের এখন পর্যন্ত পদোন্নতি দেয়নি ব্যাংকটির কর্তৃপক্ষ।
রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের সদ্য সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালকও পদায়নে অনিয়ম করে গেছেন। ব্যাংকটিতে তিনজন মহাব্যবস্থাপক থাকা সত্ত্বেও ঋণ ও অগ্রিম শাখার উপমহাব্যবস্থাপক শওকত শহীদুল ইসলামকে প্রশাসন ও মানবসম্পদ বিভাগের দায়িত্ব দিয়েছেন গত ১ সেপ্টেম্বর। বিধিমালা অনুযায়ী একজন জ্যেষ্ঠ মহাব্যবস্থাপক প্রশাসন ও মানবসম্পদ বিভাগের দায়িত্ব পান।
এ বিষয়ে শওকত শহীদুল ইসলাম বলেন, ‘ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ আমাকে যেখানে পদায়ন করবে সেখানেই কাজ করতে হবে।’ বিধিমালা অনুযায়ী মানবসম্পদ বিভাগের দায়িত্ব মহাব্যবস্থাপককে দেওয়ার কথা জানালে তিনি বলেন, ‘এটা একান্তই পর্ষদের ব্যাপার।’
জানতে চাইলে গত ৮ সেপ্টেম্বর রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক থেকে বিদায় নেওয়া ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুল মান্নান গতকাল বলেন, ‘শওকত শহীদুল ইসলামকে পর্ষদ থেকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। আমার কোনো হাত নেই।’ ঋণ বিতরণে অনিয়ম ও আত্মসাতের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে আছি। এখন কথা বলতে পারছি না।’- সূত্র: দৈনিক শিক্ষা
