রবিবার, ফেব্রুয়ারি ৫, ২০২৩
Homeঅর্থনীতিএকটি ইউটিউব চ্যানেল যেভাবে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত এক গ্রামকে বদলে দিচ্ছে

একটি ইউটিউব চ্যানেল যেভাবে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত এক গ্রামকে বদলে দিচ্ছে

একটি ইউটিউব চ্যানেল বদলে দিয়েছে কুষ্টিয়ার প্রত্যন্ত গ্রাম শিমুলিয়ার অর্থনীতি। গ্রামটির বাসিন্দারা এখন এই ইউটিউব চ্যানেলের কল্যাণে পরিবার চালানোর অর্থ আয় করছেন। কীভাবে?

দেলোয়ার হোসেন। ৪০ বছর বয়সি এই স্কুলশিক্ষক প্রায় প্রতি সপ্তাহেই কুষ্টিয়ার শিমুলিয়া গ্রাম থেকে পাবলিক বাসে করে ১০০ মাইল পথ পাড়ি দিয়ে রাজধানী ঢাকায় আসেন। সঙ্গে থাকে ৬৪ গিগাবাইটের স্যানডিস্ক মেমোরি কার্ড। ব্যাগে থাকে বিভিন্ন ফল ও সবজি। যানজটের তীব্রতা পেরিয়ে ঢাকায় পৌঁছে চলে যান একটি সাইবার ক্যাফেতে। ক্যাফেটির মালিক তার ভাতিজা লিটন আলি খান। দেলোয়ারের ব্যবসার অংশীদারও লিটন।

মেমোরি কার্ডে গ্রামের একদল বয়স্ক মানুষের রান্নাবান্নার এবং শখানেক মানুষকে খাবার খাওয়ানোর ভিডিও নিয়ে আসেন দেলোয়ার। সাইবার ক্যাফেতে গিয়ে মেমোরি কার্ডের এসব ভিডিও একটি ডেস্কটপ কম্পিউটারে ট্রান্সফার করেন তিনি। তারপর সেগুলো এডিট করে আপলোড করেন একটি ইউটিউব চ্যানেলে। ওই চ্যানেলের ৪০ লাখ সাবস্ক্রাইবার দেখেন এসব ভিডিও।

শিমুলিয়ার এক ‘কমিউনিটি কিচেনের’ রান্না করা খাবারের ভিডিও এসব। নানা জাতের মাছ, খাসি, দেশি হাঁস ইত্যাদি রান্না হয় এই কিচেনে।

দেলোয়ারের ইউটিউব চ্যানেলটির নাম অ্যারাউন্ডমিবিডি। চ্যানেলটির সাফল্য শিমুলিয়া গ্রামে একেবারেই নতুন ধরনের অর্থনীতির জন্ম দিয়েছে। শিমুলিয়া এখন পরিচিত ইউটিউব গ্রাম নামে।

অ্যারাউন্ডমিবিডি নামক ইউটিউব চ্যানেলটির কল্যাণে বাংলাদেশের গ্রামীণ খাবার সম্পর্কে জানতে পারছে সারা বিশ্ব। বিপরীতে গ্রামীণ খাবারের সংস্কৃতিকে পুঁজি করে আয় করছে গ্রামবাসী। যেসব গ্রামবাসীর আগে মিডিয়ার সঙ্গে তেমন কোনো যোগাযোগই ছিল না, তারাই এখন এসব প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে বিভিন্ন ব্যবসা করছেন। তাতে আয়ের সংস্থান হচ্ছে শত শত মানুষের।

দেলোয়ার হোসেন অ্যারাউন্ডমিবিডি চালাতে সাহায্য করেন।

লিটন অ্যারাউন্ডমিবিডি ইউটিউব চ্যানেলটি খোলেন ২০১৬ সালে। বিশ্বের নানা প্রান্তের ভিডিও দেখে তিনি মুগ্ধ হতেন। তাই ঢাকা শহরের বিভিন্ন রাস্তার ভিডিও ধারণ করে সেগুলো নিজের চ্যানেলে আপলোড করতে আরম্ভ করেন তিনি।

মিরপুরের ব্যস্ত সড়ক, হস্তনির্মিত ফুলদানি, শহরের বিভিন্ন বাজার—এসব ভিডিও আপলোড করতেন লিটন। ধীরে ধীরে তার আপলোড করা ভিডিওগুলোর ভিউ বাড়তে থাকে। চার মাসে তার চ্যানেলের সাবস্ক্রাইবারের সংখ্যা দাঁড়ায় ২০ হাজারে।

কদিন পরই লিটন সিদ্ধান্ত নেন অ্যারাউন্ডমিবিডিতে নিজ গ্রামের খাবারদাবার রান্না করার ভিডিও আপলোড করবেন। প্রথমে অনেকটা চড়ুইভাতির মতো করেই রান্নার আয়োজনের কথা ভেবেছিলেন তিনি। এসব ভিডিওই যে এত অল্প সময়ে লাখ লাখ ভিউ টেনে আনবে, তা কল্পনাও করতে পারেননি।

চ্যানেলটিতে মাসে প্রায় ৮টি ভিডিও আপলোড করা হয়। এর মোট ভিউসংখ্যা প্রায় ১৩০ কোটি। খাওয়ার ভিডিওগুলোতে খাবারের প্রশংসাসূচক কোনো কথা থাকে না। লিটন বলছেন, এই অকৃত্রিম উপস্থাপনাই তার চ্যানেলের সাফল্যের রহস্য।

২০২১ সালের মার্চে আপলোড করা এক ভিডিওতে দেখা যায়, দশজন নারী উন্মুক্ত মাঠে ১০৬ কেজি ওজনের একটি বিশালাকৃতির টুনা মাছ বয়ে নিচ্ছেন। মাছটিকে কেটেকুটে রান্না করতে কয়েক ঘণ্টা লেগে যায়। পুরো প্রক্রিয়াটি ভিডিও করা হয়।

মাছটি রান্না করা হয় বিশাল ধাতুর পাত্রে, লাকড়ির চুলায়। রান্না শেষে পাখপাখালির কলকাকলিতে মুখরিত গ্রামীণ পরিবেশে ৪০০ জন অতিথিকে খাওয়ানো হয় সেই মাছ দিয়ে।

গ্রামের সব শ্রেণির, সব পেশার, সব ধর্মের মানুষকেই খাওয়ানো হয় অ্যারাউন্ডমিবিডির ভিডিও তৈরির জন্য রান্না করা এসব খাবার।

চ্যানেলের জনপ্রিয়তা বেড়েছে। সেইসঙ্গে এখন খাওয়ার জন্য মানুষও আসে অনেক বেশি। মানুষের ভিড় সামলাতে ও ভিডিওধারণের জন্য দেলোয়ার ও লিটন এখন কর্মী নিয়োগ দিয়েছেন। চ্যানেলটির কর্মীসংখ্যা এখন ৫০ জন। তাদের মধ্যে ১৭ জন নারী।

ভিডিওধারণের কাজের নেতৃত্ব দেন অ্যারাউন্ডমিবিডির প্রথমদিকের কর্মী সজীব হোসেন। হাই স্কুলে পড়ার সময় এ চ্যানেলে যোগ দিয়েছিলেন তিনি। তার সঙ্গে থাকেন দুজন ক্যামেরাম্যান।

সজীব ও তার টিমের কারোরই ভিডিওধারণের কাজের অভিজ্ঞতা ছিল না। ইউটিউবে টিউটোরিয়াল দেখে তারা ওয়াইড অ্যাঙ্গেল, জুম শট, শাটার স্পিড অ্যাডজাস্টমেন্ট এসব শিখেছেন। তারা এখন একটি ডিজেআই ড্রোন ও পাঁচটি প্রফেশনাল ক্যামেরা দিয়ে কাজ করেন।

প্রযুক্তিগত উন্নয়ন সত্ত্বেও গ্রামে ইন্টারনেট সুবিধা এখনো সীমিত। এ কারণে ধারণকৃত ভিডিও নিয়ে দেলোয়ারকে নিয়মিত ঢাকায় আসতে হয়।

চ্যানেলটিতে প্রায়ই একই রান্না দেখানো হয় বারবার। ভিডিওতে দেখানো মানুষগুলোর চোখেমুখে থাকে অকৃত্রিম আনন্দের ঝলক।

৭০ বছর বয়সি জোবেদা খাতুনকে অ্যারাউন্ডমিবিডির ১০০-র বেশি ভিডিওতে দেখা গেছে। তিনি কখনো শিমুলিয়ার বাইরে পা রাখেননি। সম্পত্তি বলতে এক চিলতে চাষের জমি আর একটি ঘর। অ্যারাউন্ডমিবিডির কাজ করে মাসে তিনি ৩ হাজার টাকা উপার্জন করেন। সেই টাকায় তার ডায়াবেটিসের ওষুধ আর পরিবারের খাবার হয়ে যায়।

জোবেদা সংবাদসংস্থা রেস্ট অভ দ্য ওয়ার্ল্ডকে বলেন, অ্যারাউন্ডমিবিডির কল্যাণে তিনি নানা জাতের মাছ-মাংস খেতে পাচ্ছেন। এই চ্যানেল না থাকলে কখনো এসব খাবার খাওয়ার সুযোগ পেতেন না।

‘ব্রেইন ট্রায়াঙ্গলস’ বইয়ের লেখক ক্রেইগ রিচার্ড বলেন, একেবারেই সাধারণ পরিবেশে সাদামাটা পরিবেশনের মাধ্যমে খাবার খাওয়ার মাঝে এক ধরনের নতুনত্ব রয়েছে। দর্শকরা সাধারণত এ ধরনের দৃশ্য রোজকার জীবনে দেখতে পান না। এ কারণে এসব ভিডিও জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। গ্রামীণ পরিবেশে বসে এরকম সাদামাটা খাওয়া দর্শকদের মনে এক ধরনের প্রশান্তির পরশ বুলিয়ে দেয়।

অ্যারাউন্ডমিবিডির মন্তব্যের ঘর ভর্তি নানা রকমের প্রশংসায়। রুশ, ইংরেজি, স্প্যানিশ, হিন্দিসহ নানা ভাষার দর্শক প্রশংসায় ভাসিয়েছেন চ্যানেলটির ভিডিওগুলোকে।

লিটন জানান, অ্যারাউন্ডমিবিডির ৩২ শতাংশ দর্শক ও আয় আসে ভারত থেকে। বাংলাদেশ ও আমেরিকা থেকে আসে ৪ শতাংশ করে দর্শক।

রান্না হচ্ছে অ্যারাউন্ডমিবিডির জন্য খাবারদাবার।

লিটন তার ফোন নম্বর ঢাকার কয়েকটি বাজারে দিয়ে রেখেছেন। কোনো বিশেষ মাছ এলেই বাজারের বিক্রেতারা তাকে ফোন করেন। দামে বনলে মাছ কিনে নেন লিটন। বিক্রেতা মাছ পাঠিয়ে দিলে লিটন বিকাশে দাম চুকিয়ে দেন।

অ্যারাউন্ডমিবিডি তাদের আয় কত, তা জানাতে রাজি হয়নি। তবে অ্যারাউন্ডমিবিডির সমপর্যায়ের দেশের অন্যান্য ইউটিউবাররা জানিয়েছেন, অ্যারাউন্ডমিবিডির মতো একটি অ্যাকাউন্ট বছরে কয়েক মিলিয়ন ডলার আয় এনে দিতে পারে।

চ্যানেলটির ভিডিও তৈরি করতে বেশ মোটা অঙ্কের অর্থ ব্যয় হয়। প্রতি মাসে ভিডিও প্রোডাকশনের পেছনে খরচ হয় প্রায় ১ লাখ টাকা। এর সিংহভাগই খরচ হয় গরুর জিভ, গলদা চিংড়ি, তলোয়ার মাছের মতো বৈচিত্র্যময় স্বাদের খাবার কেনার পেছনে।

লিটন জানান, তারা প্রতি মাসে গড়ে ৩ লাখ টাকার মাছ কেনেন। বিশাল পরিমাণের মাছ-মাংস পরিবহনের জন্য প্রতি সপ্তাহে খরচ হয় ১৫ হাজার টাকা।

চ্যানেলটির এই সাফল্যের কারণে খুলে গেছে স্পন্সরশিপের দরজাও। এখন পর্যন্ত অন্তত ২০টি স্পন্সরশিপের প্রস্তাব পেয়েছেন বলে রেস্ট অভ দ্য ওয়ার্ল্ডকে জানান লিটন। কিন্তু ভিডিওর নিজস্বতা বজায় রাখতে সব প্রস্তাবই ফিরিয়ে দিয়েছেন তারা। স্পন্সরশিপ থেকে অনেক টাকা আসত সত্য, কিন্তু তাতে তাদের ভিডিওর সাদাসিধে ভাব ও স্বকীয়তার সঙ্গে আপস করতে হতো।

এদিকে অ্যারাউন্ডমিবিডির সাফল্য দারুণ প্রভাব ফেলেছে শিমুলিয়া গ্রামে। গ্রামটিতে মানুষের বিনোদনের জন্য তৈরি হয়েছে প্রমাণ সাইজের জিরাফের রেপ্লিকা, বিশালাকার হাঁস, খড়ের হাতি ও বাচ্চাদের জন্য একটি ওয়াটার স্লাইড। এখন একটি সিটি পার্ক তৈরির পরিকল্পনা চলছে।

এছাড়া একবার শিমুলিয়ার কয়েকটি বাড়ি আগুন লেগে পুড়ে যায়। সে সময় ইউটিউবের বিজ্ঞাপন থেকে আসা আয় দিয়ে পুড়ে যাওয়া ব্যক্তিদের নতুন ঘর তুলে দেয় অ্যারাউন্ডমিবিডি। চ্যানেলটি গ্রামের বয়স্কদের চিকিৎসাখরচও দেয়।

লিটন জানান, ‘চ্যানেলের কোনো দাদা বা মহিলা অসুস্থ হয়ে পড়লে তার ডাক্তার দেখানো বা চিকিৎসার খরচের বেশিরভাগই আমরা বহন করি।’

তবে লিটন জানেন তার ইউটিউবের এই সাফল্য অল্পদিনেই মিলিয়ে যেতে পারে। সেজন্য তিনি তার চ্যানেলের কাজে বৈচিত্র্য আনার চেষ্টা করছেন।

অ্যারাউন্ডমিবিডির আয়োজনে রান্না করা খাবার খাচ্ছে শিশুরা।

২০২০ সালে অ্যারাউন্ডমিবিডির সাবস্ক্রাইবারসংখ্যা ৩০ লাখ পেরোনোর পর লিটন ভিলেজ গ্র্যান্ডপা কুকিং চালু করেন। এই চ্যানেলেও একই ধরনের ভিডিও আপলোড করা হয়। তবে এখানে রান্না করেন সত্তরোর্ধ্ব চার বয়স্ক ব্যক্তি।

তারা বয়স্ক এবং শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে খাবার বিতরণ করেন। অভাবীদের মধ্যে কম্বল ও প্রয়োজনীয় গৃহস্থালি আসবাবও বিলি করেন তারা। ভিলেজ গ্র্যান্ডপা চ্যানেলটির বর্তমান সাবস্ক্রাইবারসংখ্যা প্রায় ১০ লাখ। লিটনের আরও কয়েকটি ইউটিউব চ্যানেল—ফরচুনেট গেস্ট, ক্রিয়েটিভ বয়েজ ক্রাফট, দ্য গ্রেট ফুডি—চালু হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে।

লিটনের স্বপ্ন শিমুলিয়া গ্রামকে আকর্ষণীয় পর্যটন গন্তব্যে পরিণত করা। এখন দেশের অনেক এলাকা থেকেই তাদের রন্ধন-যজ্ঞ দেখার জন্য লোকজন আসছে বলে জানান দেলোয়ার।

দেলোয়ার জানেন, শিমুলিয়ার প্রবেশমুখে একটি ফটক তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। এছাড়া খোকসা থেকে শিমুলিয়ায় যাওয়ার রাস্তা দেখানোর জন্য কয়েকটি পথনির্দেশক কাঠের ফলকও পুঁতবেন তারা।- দি জিবনেস স্ট্যান্ডার্ড

সর্বশেষ সংবাদ

No posts to display