বুধবার, ফেব্রুয়ারি ৮, ২০২৩
Homeঅন্যান্যজলবায়ুজনিত ঝুঁকিপূর্ণ দেশের শীর্ষে থেকেও বাংলাদেশ সাত নম্বরে

জলবায়ুজনিত ঝুঁকিপূর্ণ দেশের শীর্ষে থেকেও বাংলাদেশ সাত নম্বরে

আগামীকাল রোববার মিসরের লোহিত সাগরের তীরবর্তী রিসোর্ট শহর শারম-আল-শেখে শুরু হচ্ছে জলবায়ু সম্মেলন কপ-২৭। বিশ্বের শীর্ষনেতারা যোগ দিচ্ছেন এই সম্মেলনে। আগামী ১৮ নভেম্বর পর্যন্ত এই সম্মেলন চলবে। বাংলাদেশও এই সম্মেলনে অংশ নিচ্ছে। জলবায়ুর প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিকভাবে এখনো সেভাবে অবস্থান করে নিতে পারেনি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, বাংলাদেশ একটি দুর্যোগপ্রবণ দেশ। বিশেষ করে উপকূলে লবণাক্ততার পাশাপাশি বছর বছর ঝড়ঝঞ্ঝা লেগেই থাকে।

এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন এলাকায় বন্যা বা আগাম বন্যার মতো ঘটনা তো আছেই। গত তিন দশকে দেশে টর্নেডো-ঘূর্ণিঝড়, সিডর, আইলা এবং সর্বশেষ সিত্রাংয়ে বহু মানুষের প্রাণহানির ঘটনার পাশাপাশি কৃষি, বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঘটনা এবং আর্থিক ক্ষতি বিশ্লেষণ করলে বাংলাদেশ পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষতিগ্রস্ত দেশ হওয়ার কথা; কিন্তু আন্তর্জাতিক ইনডেক্সে বাংলাদেশ সাত নম্বরে আছে বলেই জানা যায়।

জার্মান ওয়াচের গ্লোবাল ক্লাইমেট রিস্ক ইনডেক্স-২০২১ অনুযায়ী ২০১৯ সালে মোস্ট ইফেক্টেড ১০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ নেই। এই তালিকার এক নম্বরে রয়েছে মোজাম্বিক। এরপর রয়েছে যথাক্রমে জিম্বাবুয়ে, দ্য বাহামাস, জাপান, মালাই, আফগানিস্তান, ভারত, দক্ষিণ সুদান, নাইজার ও বলিভিয়া। তবে দীর্ঘমেয়াদি ক্লাইমেট রিস্ক ইনডেস্কে ১০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান রয়েছে সাত নম্বরে। এক নম্বরে রয়েছে পুয়ের্তোরিকো। এরপর যথাক্রমে মিয়ানমার, হাইতি, ফিলিপাইন, মোজাম্বিক, বাহামাস, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, থাইল্যান্ড ও নেপাল। ২০০০ সাল থেকে ২০১৮ পর্যন্ত এই সময়ে বাংলাদেশের অবস্থান পরিবর্তন হয়নি অর্থাৎ সাত নম্বরেই দেখানো হয়েছে। প্রথম দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান ধরে রেখেছে পুয়ের্তোরিকে, মিয়ানমার ও হাইতি। তবে, বাহামাস ২০ নম্বর থেকে ছয় নম্বরে এবং ১৪ নম্বর থেকে পাঁচ নম্বর ঝুঁকিপূর্ণ দেশে উঠে এসেছে মোজাম্বিক।

কারণ হিসেবে জার্মান ওয়াচের গ্লোবাল ক্লাইমেট রিস্ক ইনডেক্স ২০২১-এ বলা হয়, ২০১৭ সালে পুয়ের্তোরিকোতে হারিকেন মারিয়া এবং হারিকেন জিনির (২০০৪) মতো বিধ্বংসী ঘটনা ঘটেছে। একইভাবে মিয়ানমারে ২০০৮ সালে ঘূর্ণিঝড় নার্গিস কঠোরভাবে আঘাত হেনেছিল।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশেও ১৯৯১ সালে প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় হয়েছিল। এরপর আইলা-সিডরে হাজারো মানুষের প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। কৃষিজমি বিলীন হয়েছে। বাড়িঘর বিলীনের ঘটনা নিত্যনৈমিত্তিক। ফসলের ক্ষতি তো আছেই। সব মিলে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে বাংলাদেশ সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এবং ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হওয়ার কথা; কিন্তু যথোপযুক্ত তথ্যউপাত্ত সংশ্লিষ্ট দফতরে উপস্থাপনের অভাবে ঝুঁকির শীর্ষে থাকার পরেও সাত নম্বরে অবস্থান করতে হচ্ছে। আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশ সেভাবে নিজেকে উপস্থাপন করতে পারছে না। ফলে ঝুঁকি বিবেচনায় যে ফান্ড পাওয়ার কথা তা-ও নিতে পারছে না বাংলাদেশ। কপ-২৭-এ অংশগ্রহণকারী সরকারের কর্তাব্যক্তিরা এ বিষয়ে যথাযথ তথ্যউপাত্ত তুলে ধরবেন বলে আশা সংশ্লিষ্টদের।

এ বিষয়ে স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদার গতকাল বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষতিগ্রস্ত রাষ্ট্রগুলোর তালিকায় কোনো কোনো তথ্যে বাংলাদেশের অবস্থান সাত নম্বরে দেখানো হচ্ছে। বাস্তবিক অর্থে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল যারা চেনেন, জানেন; বাংলাদেশের নদীভাঙন যারা দেখেছেন; নিম্নাঞ্চল যারা দেখেছেন; বাংলাদেশের আইলা, সিডর, সিত্রাং এবং সিলেটে সাম্প্রতিক বন্যা যারা দেখেছেন তারা বুঝতে পারবেন জলবায়ু পরিবর্তনে বাংলাদেশের অবস্থান কেমন। তিনি বলেন, যেসব র্যাংকে বাংলাদেশকে সাত নম্বরে দীর্ঘমেয়াদি ক্লাইমেট ভালনারেবল কান্ট্রি হিসেবে রাখা হয়েছে, সেখানে যদি বাংলাদেশের আগের ছয়টি রাষ্ট্রের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয় তাহলে দেখা যাবে এই রাষ্ট্রগুলোর মোট লোকসংখ্যা বাংলাদেশের একটি জেলার লোকসংখ্যার সমান বা অনেক ক্ষেত্রে কম। সে ক্ষেত্রে কোনোভাবেই লোকসংখ্যার দিক বিবেচনায় বাংলাদেশের চেয়ে বেশি ভালনারেবল কোনো দেশের মানুষ আছে বলে মনে করি না। সে কারণে আগামী দিনে যাতে ভালনারেবল ইনডেক্স তৈরি করার সময় বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যাকে বিবেচনায় নিয়ে তৈরি করা হয়, সে লক্ষ্যে বাংলাদেশের পলিসি মেকার, অ্যাকাডেমিশিয়ান বা অন্যান্য গবেষক যারা রয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তথ্যউপাত্তের ভিত্তিতে সে জায়গায় কন্ট্রিবিউশন রাখবে এমনটাই আশা করছি।

গত বৃহস্পতিবার মিসর জলবায়ু সম্মেলন (কপ-২৭) সামনে রেখে আয়োজিত এক ওয়েবিনারে বক্তারা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিপূরণ বাবদ সৃষ্ট তহবিলে অর্থ না দেয়ার জন্য চলতি ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ একটি অজুহাত হিসেবে দেখাতে পারে উন্নত বিশ্ব। কিন্তু এ বিষয়ে বাংলাদেশের মতো ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে সোচ্চার হতে হবে। উন্নত বিশ্ব ইচ্ছে করেই সম্মেলনের দিন বাড়িয়ে দেয়। ততদিনে অনেকে নিজ দেশে চলে যায়। ফলে তাদের অনুপস্থিতিতে অনেক সিদ্ধান্ত হয়ে থাকে। এ বিষয়ে সিভিএফভুক্ত (জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিপদাপন্ন দেশের ফোরাম) দেশগুলোকে সোচ্চার থাকতে হবে।

প্রধান অতিথি পরিবেশ বন ও জলবায়ুবিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি সাবের হোসেন চৌধুরী বলেন, এবারে জলবায়ু সম্মেলনের ত্রিশ বছর পূর্ণ হচ্ছে। এতদিনে বৈশ্বিক পরিস্থিতি ঠিক হয়ে যাওয়ার কথা; কিন্তু তা তো দূরের কথা, দিন দিন পরিস্থিতি আরো অবনতি হচ্ছে। এটা বৈশ্বিক লিডারশিপের ব্যর্থতা।

জলবায়ু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আইনুন নিশাত বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ এ দুই ধরনের ক্ষয়ক্ষতি আছে। দুই ধরনের ক্ষতির বিষয়টি জলবায়ু সম্মেলনে তুলে ধরতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর সাবেক মুখ্য সচিব আবুল কালাম আজাদ বলেন, কপে আগের বছরগুলোতে যা আলাপ হয়েছে ঘুরে ফিরে বিশ্ব সেখানেই আছে। পাঁচ বছরে ৫০০ বিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দেয়ার কথা বলা হয়েছিল; কিন্তু এ নিয়ে খুব বেশি আলাপ হয়নি। টাকা পাবো না এটাই সঠিক। তারপরও আমাদের কথা আমাদের বলে যেতে হবে।

এ দিকে গতকাল শুক্রবার রাজধানীর সিদ্ধেশ^রীতে স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্র (ক্যাপস), পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের আয়োজনে ‘ডায়ালগ উইথ মিডিয়া রোড টু কপ-২৭ : দি ইমপর্টেন্স অব ট্রানজিশন টু ক্লিন এনার্জি’ শীর্ষক এক কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়। পরিবেশ উদ্যোগ এবং সেভ আওয়ার সি-এর সার্বিক সহযোগিতায় আয়োজিত এ কর্মশালায় মূল আলোচনায় বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্র (ক্যাপস)-এর প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদার বলেন, বর্তমানে নবায়নযোগ্য জ্বালানি রয়েছে ৩.৭১ শতাংশ। বর্তমান বৈশ্বিক যে যুদ্ধ পরিস্থিতি জ্বালানি সঙ্কটকে আরো ত্বরান্বিত করছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির পর্যাপ্ত ব্যবস্থা থাকলে বিশ্ববাসীকে এই সঙ্কট দেখতে হতো না। তিনি বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশের ১৩ স্থানে বায়ুবিদ্যুতের প্রকল্প চলমান রয়েছে। পাশাপাশি সৌরশক্তিসহ বায়োগ্যাসের মাধ্যম নবায়নযোগ্য জ্বালানি সক্ষমতা বৃদ্ধি করা সম্ভব। যার মাধ্যমে ২০৩০ ও ২০৪১ সালে জ্বালানি লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব। কপ-২৭ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এবার ক্ষয়ক্ষতির হিসাব নিয়ে জোরালো আলোচনা হবে। এ বিষয়ে গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্র্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, মার্সেড, যুক্তরাষ্ট্রের পিএইচডি গবেষক ও স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটির পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক মো: হুমায়ন কবির বলেন, বর্তমান পৃথিবীর ৭০ ভাগ গ্রিন হাউজ গ্যাস নিঃসরণ হয় জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে। তাই জলবায়ু পরিবর্তন হ্রাস বা প্রশমিত করার জন্য প্রথম পদক্ষেপ হওয়া দরকার জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তর। তিনি আরো বলেন, কপ-২৭ পৃথিবীব্যাপী জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে টেকসই নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

কর্মশালায় প্রধান অতিথি ছিলেন প্রেস ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ (পিআইবি)-এর মহাপরিচালক জাফর ওয়াজেদ। স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ-এর সাবেক ভিসি অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী নকীর সভাপতিত্বে এতে আরো উপস্থিত ছিলেন- সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মারুফা গুলাশান আরা, স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. মাহমুদা পারভীন, প্রভাষক মাহমুদা ইসলাম, সেভ আওয়ার সি-এর সাধারণ সম্পাদক গাজী আনোয়ার প্রমুখ।- দৈনিক শিক্ষা

সর্বশেষ সংবাদ

No posts to display